Museum History

Home Museum History

সেগুন বাগিচার বাড়িটা
মাহবুব আলম

কিছুদিন ধরে একটা বিদায়ের সুর বাড়িটার বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
চলে যেতে হবে এখান থেকে। কমতো নয়, এক এক করে ঊনিশটা বছর কেটে গেল। সেই ঊনিশশ’ পচানব্বই থেকে দু’হাজার পনের। বাড়িটার প্রতি সবার মায়া পড়ে গেছে। গাছগাছালি দিয়ে ছায়াঘন বাড়িটা, শতবর্ষি এবং বনেদিয়ানায় ঘেরা। কেমন একটা পুরাতন সোঁদা সোঁদা গন্ধ। মনে হয় নিজেদের বাড়ি, বাপ দাদার। এখানেই জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত কেটে যায় এখানেই, কাজের ব্যস্ততায়, অবসরে প্রাণখোলা গল্পগুজব আর নির্দোষ হাসি-আড্ডায়।
প্রতিদিন সকালে বাজার হয়, নিজ বাড়ির মতোই। বাজার থেকে আনা সদাইপাতি কাটাকুটি হয়, চুলোয় রান্না চাপানো হয়, বাচ্চা ছেলেমেয়ের উৎসূক্য নিয়ে রান্নাঘরের দিকে উঁকি ঝুকি দেয় কেউ কেউ, ঘুর ঘুর করে আসে পাশে। চূলো থেকে ভাত তরকারি নামলেই থালা হাতে এগিয়ে যায়। ধোঁয়া ওঠা ভাত, সাথে গরম তরকারি। চনমনে ক্ষুধা নিয়ে ভরপেট খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুুলে আবার স্ব-স্ব কাজের নিমগ্নতায় ফিরে যায়। সকালে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দিয়েই চলে আসে সবাই দোতলার এক চিলতে বারান্দায়, সেই খাওয়ার জায়গায়, বিকেলেও একই দৃশ্যের অবতারণা হয়। এসেই নিজ বাড়ির অধিকার নিয়ে হাঁক পাড়ে, কই খালা, চা দাও। দুপুরের ভাতের মতই সকাল বিকেল চা বরাদ্দ এখানে সবার। চা খেতে খেতে এক রাউন্ড আড্ডাও হয়ে যায়।
প্রতিদিন অতিথি থাকে পাঁচ-সাতজন। মুক্তিযোদ্ধা, পরিচিত সুহৃদ,  জাদুঘরের পরম বন্ধুজন। সবারই পাত পড়ে এখানে, পেট খালি রেখে ফেরেন না কেউ এখান থেকে। আবার এমনও হয়, প্রেসক্লাব, সচিবালয় এবং আসেপাশের এলাকায় কাজে এসেছেন, ঠিক দুপুরে চলে এলেন জাদুঘরে। এসেই বসে পড়লেন প্লেট নিয়ে। তিনি জানেন, তার খাবার এখানে তৈরি রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধারা এখানে আসেন দূর দূরান্ত থেকে। কর্তৃপক্ষ বলে দিয়েছেন তাদের খাতির যতœ করতে হবে। দেশের সূর্য সন্তানদের অবহেলা করা যাবে না, তাদের আনএ্যটেন্ডেড রাখা যাবে না। শুনতে হবে তাদের সমস্যাদি। করে দিতে হবে কাজ দ্রুততার সাথে, ওয়ান স্টপ সার্ভিস দিয়ে। তারা আসেন, কখনও দল বেধে, একা কখনও। এলেই কফিশপ ম্যানেজার চা, বিস্কুট, সিংগাড়া পরিবেশন করে। তাদের কাজ দ্রুততার সাথে হয়ে যায়। যাওয়ার সময় সন্তুষ্টি আর কৃতজ্ঞতার হাসি মুখে ঝুলিয়ে বলেন, আপনাদের মত ব্যবহার আর সমাদর আমরা কোথাও পাই না, আমাদের অনেকেই বিরক্তির চোখে দেখে, অপাংক্তেয় মনে করে। একাত্তরের সাহসী যুবক এরা, যুদ্ধের মাঠের দুর্দান্ত সৈনিক। সবার এখন পরিণত বয়স, বয়সের ভারে নূহ্য, রোগে শোকে দু:খে দারিদ্রে চেহারা কেমন ম্রিয়মাণ। চাওয়াও তাদের বেশী নয়, ভারতের প্রশিক্ষণ তালিকায় তাদের নাম আছে কিনা, থাকলে তার স্ক্যান কপিসহ  প্রত্যায়ন পত্র তারা পেতে চান। যখন তখন মুক্তিযোদ্ধা তালিকা যাচাই বাছাই হয়। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রামাণ্য দলিল থাকলে আর ভয় থাকে না। অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা ভাতার ওপর নির্ভরশীল। এটা বাতিল হয়ে গেলে পড়তে হবে বিপদে। হায়রে আমাদের সূর্যন্তানেরা! মানুষের কত কিছু হোল, কোথা থেকে কে কোথা চলে গেল। নিতান্তই অবহেলা ভরা জীবন আর দারিদ্রের কষাঘাত নিয়ে এরা জীবনটাই পার করে দিল। কেন এমন হলো? এর জবাব চান কেউ কেউ জাদুঘরে এসে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরতো তাদের সম্পদ, এটা তাদের নিজস্ব ভুবন। এই বাড়িটাও তাদের প্রিয়। এখান থেকে চলে যাওয়ার কথা শুনে তাদের মন খরাপ হয়ে যায়। তারা বলেন, জাদুঘর যাক, এই বাড়িটা রেখে দেন আমাদের জন্য।
আত্মীয় নয় আবার পরমাত্মীয়। নিজেদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাগুলো এখানে বেটে নেয় সবাই। যেন একটা একান্নবর্তি ভরভরাট সংসার। কারও ক্রাইসিস এলে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কারও সাকসেসের খবর এলে, যেন নিজের সাকসেস- এই মনে করে আনন্দে উদ্বেলিত হয়, আবার কারও দুঃখে তার সাথে হয় সমব্যাথী। সামান্য কারণ নিয়ে কখনও খুনসুটি লাগে, আবার মিটেও যায় নিজেদের মত করে।
এই বাড়িটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের একটা পারিবারিক গন্ডি ভেঙ্গে যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসছে। একটা ছোট আঙ্গিনা। দোতালা থেকে নেমে এসেছে প্যাঁচানো সিড়ি। ছনের ছাউনীর চারটা ছাতা। চমৎকার ছায়াঘন বসার জায়গা। জাদুঘর দেখে এসে ভিজিটররা এখানে বসে জিড়িয়ে নেন, চা-কফি খান। একটা কফিশপ, ছোট কিন্তু চমৎকার স্বাদের কফির জন্য ইতিমধ্যে বিখ্যাত হয়ে গেছে। মানানসই একটা স্থায়ী মঞ্চ। হররোজই এখানে এ-গোষ্ঠি ও-গোষ্ঠির অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। আর থাকে জাদুঘরের নিয়মিত অনুষ্ঠানমালা। বিকেল হলেই জাদুঘরের আঙ্গিনা জনসমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে। বাড়িটার স্বল্পপরিসর জায়গা; কিন্তু  ট্রাস্টিবৃন্দ খুবই পরিকল্পিতভাবে এর প্রতিটি ইঞ্চি নান্দনিক সৌন্দর্যমন্ডিত আর ব্যবহারোপযোগী করে তুলেছেন। প্রবেশ পথের ডান ধারের ছোট হলরুমের মত জায়গাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে অডিটেরিয়াম- কাম সেমিনার রুম। নিয়মিতই সেখানে চলে ওয়ার্কশপ, সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন এবং খুচরো ধরনের অনুষ্ঠান। ডানপাশের গুমটি ঘরের মত ছোট কুঠরীর মত ঘরটি হয়ে গেছে টিকেট কাউন্টার। দেশী বিদেশী উভয় ধরণের দর্শকের জন্য প্রবেশমূল্য পাঁচ টাকা।
মূল গৃহের নিচ ও উপরতলা মিলিয়ে ছয়টি গ্যালারী কক্ষ। আবহমান বাংলা থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্বের ধারাবাহিকতা টেনে এখানে নিদর্শনসমূহ প্রদর্শিত হয়। ছয়জন গ্যালারী গাইড সার্বক্ষণিকভাবে ভিজিটরদের প্রদর্শনীগুলোর সাথে পরিচিত হতে সাহায্য করে। সবাই এখানকার পরিবেশ ফ্রেন্ডলি বা বন্ধুসুলভ বলে মনে করেন। নিজেদের বাড়িতে এসেছেন মনে করে তারা বাড়িটার সব কিছুর সাথে একাত্মা হয়ে যান। যখন তারা শোনেন সামনের সেপ্টেম্বরে আমরা নিজেদের জাদুঘর ভবনে চলে যাবো, তখন মনের মধ্যে হু হু কষ্টের বাস নিয়ে তারা অনেকটা ধরা গলায় বলেন, তাহলে এই বাড়িটার কি হবে? আর বিদেশী ভিজিটররা বলেন, আচ্ছা তোমরা এই বাড়িটা রেখে দিতে পারো না জাদুঘরের একটা অংশ হিসেবে? কত পুরানো বাড়ি, অতীতের পরম্পরা নিয়ে এটাওতো হতে পারে একটা জাদুঘর।
আউটরিচ কর্মসূচির ছেলেমেয়েরা আসে। জাদুঘরের ভাড়া করা বাস তাদের নিয়ে আসে আবার দিয়ে আসে। বাস থেকে হুড়মুড় করে নেমেই দেয় ছুট আঙ্গিনার দিকে। সংগে আসা শিক্ষকরা তাদের সামাল দিতে হিমসিম খান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস নামের ফিল্ম দেখে তারা জাদুঘরে ঢোকে, গ্যালারী গাইড মেয়েরা তাদের পাখীর বুলি শেখানোর মত করে প্রদর্শনীগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। মনোযোগী ছাত্র-ছাত্রীর মত তারা খাতায় নোট নেয়। বের হয়েই কুইজ পরীক্ষায় বসতে হয়। ব্যাস, এরপর তাদের ছুটি। অপার স্বাধীনতা নিয়ে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে তারা মেতে ওঠে। শুরু হয় আঙ্গিনা জুড়ে ছুটোছুটি, হুটোপুটি। গালগল্পে, হাসিতে খুশীতে মাতোয়ারা হয়ে থাকে কিশোর- কিশোরী, তরূণ-তরুণীরা। কুইজ পরীক্ষায় পুরস্কার যারা পায় তারা খুশী, পায়না যারা তারাও সমভাবে খুশী। এই বাড়িটায় আর জাদুঘর থাকবেনা শুনে তারা যারপর নেই ব্যথিত হয়ে পড়ে। বাড়িটাতো তাদের নিজেদের বাড়িঘরের মত। নতুন জাদুঘরেতো পরমাত্মীয়ের মত এই বাড়িটা থাকবে না।
সবার কত মায়া বাড়িটার জন্য! যারা স্বল্প সময়ের জন্য আসেন তারা বাড়িটার প্রতি পরম মমত্ববোধ থেকে এটা রেখে দেয়ার কথা বলেন। আর যারা দীর্ঘদিন এখানে থেকে কাজকর্ম করছেন, নিজের বড়িঘরের মত এটাকে ব্যবহার করছেন, তাদের বুকের গহনেতো একরাশ কান্নার বাস। কিন্তু করারতো কিছু নেই। সময় শুধুই ভাঙ্গছে আর গড়ছে। এই প্রক্রিয়ার খেলায় কিছুই ধরে রাখা যায় না, ধরে রাখার উপায় নেই।
অর্থমন্ত্রী মুহিত স্যার সময় পেলেই জাদুঘরে চলে আসেন। জাদুঘরের অন্যতম সুহৃদ তিনি। সরকারের জিওবি খাত থেকে বড় অংকের অর্থ যোগান দিয়েছেন জাদুঘর ভবন নির্মাণের জন্য। নিজের বিশাল সংগ্রহশালা দান করেছেন জাদুঘরে। সেখানে থরে থরে সাজানো মণিরতœতূল্য মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য দলিল। এ বছর বিজয় দিবস অনুষ্ঠানমালার শেষ দিনে তার আমেরিকা প্রবাসী মেয়েকে নিয়ে হাজির হয়েছেন জাদুঘরে বেশ রাত করে । অনুষ্ঠান সবে শেষ হয়েছে, শিল্পিরা মঞ্চ থেকে নেমে আসছে। অফিসে বসাই তাকে। রাষ্ট্রীয় কাজে অতি ব্যস্ততায় থাকা শ্রদ্ধেয় মানুষটিকে সেদিন একান্ত ঘরোয়া পরিবেশে খোশমেজাজে  পাওয়া যায়। কফি খেতে খেতে তিনি পুরোনো দিনের গল্পের ঝাঁপী খুলে ধরেন। সবিস্তারে বলেন হরতালের দিন কিভাবে তিনি রিকসা ভ্যানে চেপে জাদুঘরের উদ্বোধনী দিনে এসেছিলেন বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে। এক ফাঁকে তাকে জিজ্ঞেস করি, বাড়িটার গেটে শ্বেত পাথরের ওপর লেখা আছে আব্দুল মজিদ সিএসপি, তিনি কোন ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন? যেন গল্পের আর একটি সূত্র পেয়ে যান। বলেন, তিনি ছিলেন বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের, পার্র্টিশনের পর পাকিস্তান সরকার পাঁচজন বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের অফিসারকে সিএসপি হিসেবে আত্মিকরণ করে, আব্দুল মজিদ মোল্লা ছিলেন তাদের একজন। খুবই ডাক সাইটে অফিসার ছিলেন তিনি। এই বাড়িটি তিনি তৈরী করেছিলেন না ক্রয় সূত্রে পেয়েছিলেন মুহিত স্যারের কাছে তা জানা হয়নি।

এটা সেই সময়।
মুক্তিযুদ্ধের রজত জয়ন্তীর বছর চলে এল, মানে পঁচিশ বছর হয়ে গেল দেশ স্বাধীন হওয়ার। মুক্তিযুদ্ধকে ধরে রাখার কোন প্রতিষ্ঠান এখনও তৈরী হল না। না সরকারী উদ্যোগ, না বেসরকারী। মুক্তিযুদ্ধতো এই সেদিনের জ্বলজ্বলে স্মৃতি, অনেক কষ্টের, অনেক ভালবাসার। এর দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে একটা স্বাধীন দেশের, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, বাংলাদেশের। একটা বিজাতীয় শক্তি, একদল হায়েনার পাল জবরদখল করে রেখেছিল দেশটাকে। খাবলে খাবলে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছিল দেশের মাটিকে, রক্ত আর মৃত্যূর হলি খেলায় মেতে উঠেছিল। কত মানুষের আত্মত্যাগ আর জীবন বাজী রেখে লড়ে যাওয়ার কিংবদন্তিতূল্য গল্পকাহিনী তৈরী হয়েছিল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু কোথাওতো এর স্মৃতি রইল না।
তাহলে কি সব কিছু মুছে যাবে? মুছিয়ে দেয়া হবে সব কিছু? স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি অতিমাত্রায় তৎপর। দীর্ঘদিন রাষ্ট্র ক্ষমতায় তারা। মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে তারা, ধীরে সুস্থে, সুদুর প্রসারী চিন্তা ও পরিকল্পনা থেকে। একাত্তর হচ্ছে একটা গ গোলের বছর। ‘সেই সময় হানাদার বাহিনী বাঙ্গালী জাতীর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিল, মেজর জিয়া কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হইতে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন, বাংলার দামাল ছেলেরা অস্ত্র হাতে তুলিয়া নিল এবং নয়মাস যুদ্ধ করিয়া দেশের স্বাধীনতা ছিনাইয়া আনিল’- এই ছিল তখন পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত স্বাধীনতার ইতিহাস।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন ধাপ, উনসত্তরের গণঅভূত্থানে যার চরম বহিঃপ্রকাশ। ছয় দফা দাবী দিয়ে বঙ্গবন্ধুর দেশের মানুষকে ম্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো এবং তা আদায়ের জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়া। সত্তরের নির্বাচনে বিপুল ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও রাষ্ট্র পরিচালনা ক্ষমতা না দেওয়ার জন্য ইয়াহিয়ার টালবাহানা। মার্চের সাত তারিখে তখন জাতীর উদ্দেশে তিনি বললেন, রক্ত যখন দিয়েছি, আরও দেব, বাংলার মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। তারই মত আর এক সিংহ পুরুষ ভারতবাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন, তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব। তিনিও বাঙ্গালী, নেতাজী সুভাষ বসু। বাঙ্গালীদের সৌভাগ্য যে তারা দুজন কালজয়ী নেতাকে পেয়েছিল, যাঁরা মানুষকে গভীর স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন। এ যেন হ্যামিলনের বংশীবাদক, বাঁশীর সুরের যাদুতে সবাইকে মোহবিষ্ট করে পেছনে পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়া। নেতাজী পারেননি কিন্তু বঙ্গবন্ধু পেরেছিলেন। মানুষকে তিনি চিরলালিত স্বপ্নের বাংলাদেশ এনে দিতে পেরেছিলেন।

পচিশে মার্চ রাতের ক্রাক ডাউন। অপ্রস্তুত মানুষের ওপর সেদিন পাকিস্তানী সামরিক জান্তা প্রয়োগ করেছিল বিশাল সামরিক শক্তি। প্রচন্ড মত্ততা, হিং¯্রতা, বর্বরতা আর ভয়াবহতা দিয়ে তারা এক ঝটিকায় দখলে নিতে চেয়েছিল সমগ্র বাংলাদেশকে। ম্বাধীন বাংলাদেশ চাওয়ার স্বপ্নকে চিরতরে ধূলিস্যাৎ করে দিতে চেয়েছিল চরম নৃশংসতা আর বর্বরতা দিয়ে। শুরু করেছিল নৃশংসতম গণহত্য। ধারণায় ছিল তাদের নৃশংস সামরিক শক্তি প্রয়োগ বাঙালি জাতিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেবে। মিটে যাবে তাদের স্বাধীন হওয়ার স্বপ্নস্বাধ।
কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। প্রাথমিক আঘাত সামলে নিয়ে ঘুরে দাড়িয়েছে মানুষ। সৃষ্টি হয়েছে কত ইতিহাস। প্রাথমিক আক্রমণকে প্রতিঘাত করেছে পরম বিক্রমে প্রতিরোধ দিয়ে। ভেতো বাংগালী, যাদের এতদিন তারা অবহেলা করেছে নন-মার্শাল জাতি  হিসেবে, তারা প্রশিক্ষণ নিয়েছে, অস্ত্রহাতে নিয়েছে, শুরু করেছে গেরিলা যুদ্ধ, সন্মুখ যুদ্ধ। স্বাধীন বাংলা সরকার গঠন করেছে। সেই সরকার সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করেছে মুক্তিযুদ্ধ, কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন করেছে ভারতের সহযোগীতায়। করেছে আন্তর্জতিক সমর্থন আদায়। নিজেদের বেতার, নিজেদের সংবাদপত্র, নিজেদের সাংস্কৃতিক দল, ফুটবল দল, সামরিক বাহিনী, নৌ বাহিনী, বিমান বাহিনী। কি ছিল না সেই সরকারের?
যুদ্ধের ফ্রন্টে শত্র“কে যুদ্ধ দিয়েই মোকাবেলা করতে হয়। শত্র“র বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সামরিক বিজয়ই একটা দখলদার ভুখন্ডকে মুক্ত ও স্বাধীন করতে পারে। এজন্য প্রয়োজন হয় পরম বিশ্বস্ত কিন্তু শক্তিশালী মিত্রের। ভারতকে পাওয়া গেছে সেই মিত্র হিসেবে। কৌশলগত মিত্র হিসেবে এগিয়ে এসেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষ এগিয়ে এসেছে সমর্থন ও মানবিক সাহায্য নিয়ে। মিত্রবাহিনী  এগিয়ে এসেছে অস্ত্র, গোলাবারুদ, রসদসামগ্রীর সাহায্য নিয়ে। মুক্তিবাহিনীকে দিয়ে গেছে সকল ধরনের লজিষ্টিক সাপোর্ট। শেষে গঠিত হয়েছে যৌথবাহিনী। শুরু হয়েছে সর্বাত্মক যুদ্ধ। এসেছে ষোলই ডিসেম্বর। যুদ্ধে পরাজিত জেনারেল নিয়াজীর তিরানব্বই হাজার পাকিস্তানী সৈন্যসহ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অভ্যূদয় হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।
যুদ্ধের নয় মাসে কত অত্যাচার, নিপীড়ণ, নৃশংসতা আর ভয়াবহতার মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়েছে দেশের  মানুষকে। সব সময় গভীর ভয় আর ত্রাস গ্রাস করে রেখেছে তাদের। কখন কোন দিক থেকে মৃত্যূ এসে থাবা বসাবে, এই ভয় সর্বক্ষণ। বড়ই হীনমন্যতায় ভরা জীবন। হারিয়ে গেছে তিরিশ লক্ষ মানুষ, পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবি হত্যা হয়েছে। এককোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে অমানবিক  জীবন যাপন করেছে। আড়াইকোটি মানুষ আভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যূত হয়েছে। দু’লক্ষ নারী অসহায়ভাবে তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছে।
দেশটা প্রায় ধংসস্তুপেই পরিণত করে গেছে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনী। ফিনি´ পাখীর মত ধংসস্তুপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে দেশ। উন্নতি হচ্ছে এর। বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর অপশক্তি দ্বারা অবৈধ রাষ্ট্রিয় ক্ষমতাদখল, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির উত্থান, মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলোকে অস্বীকার ও ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টারত তারা। আর কিছুদিন গেলে সব কিছুই শেষ করে দেবে। এখনও সময় আছে কিছু একটা করার- এই ভাবনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ কজন মানুষ একসাথে হন। অনেক আলোচনার পর তারা একটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
এজন্য একটি প্ল্যাটফর্ম দরকার। গঠন করেন তারা মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাষ্ট। এই ট্রাস্টেরই একটি প্রজেক্ট হবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ডাঃ সারওয়ার আলী, আসাদুজ্জামান নূর, আলী যাকের, সারা যাকের, রবিউল হুসাইন, মফিদুল হক, আক্কু চৌধুরী ও জিয়াউদ্দিন তারিক আলী- এই আটজন হন ট্রাস্টি। প্রাথমিক ফান্ড তারাই যোগান দেন।
শুরু হয়ে যায় দৌড় ঝাঁপ। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হবে; কিন্তু সেটাতো সহজ নয়। ব্যাপারটা এমনও নয়, আমরা চাইলাম আর কিছু জিনিস দিয়ে একটা ঘর সাজিয়ে ঘোষণা দিলাম, এটা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, আপনারা দেখতে আসেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধ থাকতে হবে। থাকতে হবে এমনভাবে যেন মানুষ এসে দেখতে পায় জীবন্ত মুক্তিযুদ্ধকে, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে হেটে যেতে পারে। সত্যিকারভাবে এখানে ধরা দেবে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, আন্দোলন, সংগ্রাম, প্রস্তুতি, পাকবহিনীর আগ্রাসন, হত্যা, নির্যাতন, প্রতিরোধ, যুদ্ধ ও চূড়ান্ত বিজয়। থাকবে মানুষের ত্যাগ, তিতিক্ষা, শৌর্যবীর্য ও সাহসিকতার অমূল্য সব নিদর্শন। অবশ্যই তা হবে সত্যনির্ভর এবং নিরপেক্ষ। যার যেখানে অবস্থান নির্মোহ দৃষ্টি থেকে তাকে সেখানে রাখা হবে।
জাদুঘরতো হবে, তার জন্য একটা পছন্দনীয় জায়গা লাগবে। থিতু হয়ে সেখানে বসে প্রস্তুতিমূলক কাজ সাড়তে হবে, সব যোগাড়যন্তর করতে হবে। এখানে সেখানে বসে আলোচনা করা যেতে পারে কিন্তু জাদুঘরের জন্য খোলা পরিসর নিয়ে একটি বাড়ি পেতে হবে। যেখানে থাকবে গ্যলারী প্রদর্শনীর জন্য কয়েকটি কক্ষ। সুতরাং হন্যে হয়ে বাড়ি খোঁজা চলে, মেলে না। জাদুঘরের জন্য কে এমন বাড়ী দেবে ঢাকাশহরের প্রাণকেন্দ্রে? যাও দু’চারটার খোঁজ পাওয়া যায় সংগতিতে তা কুলোয় না।
ষাট দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা, রাজনীতিবীদ, পেশাজীবি সাংস্কিৃতিক আন্দেলনে পুরধা ব্যক্তি ডাঃ সারওয়ার আলী ২০১০ সালে ‘পেরিয়ে এলাম অন্তবিহীন পথ’ নামে চমৎকার স্মৃতিচারণমূলক একটি বই লিখেছেন। সেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। কি দূর্দমনীয় নেশার ঘোরে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন করেছেন ট্রাস্টিরা প্রস্তুতিপর্বের সেই দিনগুলোতে! স্বপ্নের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তৈরী করতে চলেছেন তারা, সামনে কত কাজ, কত চ্যলেঞ্জ! সব কিছু মোকাবেলা করে পরম আরধ্যের দিকে একাগ্র চিত্তে এগিয়ে গেছেন তারা।

বাড়ী পাওয়ার সমস্যায় যখন তারা হিমসিম খাচ্ছেন, কিছুতেই মিলছে না স্বল্পভাড়ায় সুবিধেমত বাড়ী, তখন সকল কাজের কাজী মুক্তিযুদ্ধের প্রতি পাগল হয়ে থাকা উদ্যোমী মানুষ আক্কু চৌধুরী একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। আছে একটা বাড়ী ৫ সেগুন বাগিচায়। সেটা দেখা যেতে পারে। দেখা হয় এবং বাড়িটা সবার পছন্দ হয়ে যায়। আক্কু চৌধুরীর বোন স্বাতী মজিদের স্বশুর সাহেব মরহুম আব্দুল মজিদ সিএএসপির বাড়ি সেটা। দোতলা সিংগেল ইউনিটের বাড়ি, অনেকটা জায়গা নিয়ে। সামনে পেছনে উম্মুক্ত চত্বর, আট দশটা কক্ষ। কলোনিয়াল পিরিয়ডের পুরাতন বাড়ি, সামনে শ্বেতপাথরের ওপর লেখা আনন্দ ভবন। জাদুঘর প্রতিষ্ঠার জন্য আদর্শ বাড়িই বলতে হবে। স্বাতী মজিদ হচ্ছেন আক্কু চৌধুরীর ছোটবোন। ভাইবোনের শলাপরামর্শ। রাজী করিয়ে ফেলেন আক্কু তার বোন স্তস্বাতীকে।
ব্যস, বাড়ী পাওয়া গেল; কিন্তু বড় একটা সমস্যা থেকে গেল। বাড়িতো অবৈধ দখলদারদের কবলে। প্রিন্টিং প্রেস, খোপে খোপে ব্যাবসার নামে আরও মানুষ, এমনকি সেখানে বকরি-ছাগলও পোষা হয়। ভাড়াও তারা ঠিক মত দেয় না। বাড়ীওয়ালার সাফ কথা, বাড়ী ভাড়া নিতে পারেন কিন্তু আপনাদের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে তা নিতে হবে। ঢাকা শহরে ভাড়াটিয়া তোলার কাজটি সবচেয়ে কঠিন। সহজ প্রকৃতির মানুষ হয়না অবৈধ দখলদাররা। পেশীশক্তি  থাকে তাদের পেছনে। থাকে নানা ধরনের মারপ্যাঁচ আর কারসাজি। আইনের আশ্রয় নেয়। ধীর্ঘসুত্রিতায় পড়ে যায় বাড়ী খালি করার ব্যাপারটা। কিন্তু বাড়িটি দখলে নিতে হবে দ্রূত। দেরী করলেই বিপদ। ট্রাস্টিরা বুদ্ধি খোঁজেন। অনুরোধ উপরোধে কাজ হয় না। ভাড়াটিয়ারা জানিয়ে দেন তারা বাড়ী ছাড়বেন না। কি আর করা, কূটচালের আশ্রয় নিতেই হয়। বিখ্যাত বাকের ভাই এগিয়ে আসেন। আসাদুজ্জামান নূর তখন বাকের ভাই নামে আকাশখ্যাত জনপ্রিয় হয়ে গেছেন। বাকের ভাই জিন্দাবাদ দিয়ে তাকে দেখলেই অনেক লোক জুটে যায়, মৌচাকের ভিড় জমে চারপাশে। তুখোড় ছাত্রনেতা আর বামপন্থী রাজনীতি করার কারণে দলের কর্মী অনুসারীও তার কম নয়। তিনি কায়দা করে তাদের কাজে লাগান। জোড় জবরদস্তি নয়, শুধু দলবেধে তাদের উপস্থিতি আর বাড়ি খালি করার ডেট লাইন বেধে দেওয়া।
আলী যাকের, সারা যাকের তখন অভিনয় খ্যাতির তুঙ্গে অবস্থান করছেন। টিভি নাটকের ছোট চাচার চরিত্রে অভিনয় করে আলী যাকের সবার মুখে মুখে ছোটচাচাই বনে গেছেন। ‘তুই রাজাকার’ ডায়লগ খুব জনপ্রিয় হয়েছে। নুরুলদিনের সারাজীবন নাটকে আলী যাকের ও আসাদুজ্জান নূরের মঞ্চ কাঁপানো অভিনয় আর সেই হুংকার তুলে ডাক, আইসো বাহে কে কোন্ঠে আছেন…,তখন সবার মুখে মুখে। তাদের ব্যক্তিগত উপস্থিতিও অনেক কাজ দেয়। ভাড়াটিয়ারা বুঝে নেয় কোন ফন্দিফিকির আর কাজে দেবেনা। বাড়ি খালি করে দিয়ে তারা চলে যান।
আর দেরী নয়, ট্রাস্টিরা কাজে নেমে পড়েন। আবেদন জানান সবার কাছে এই জানিয়ে যে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, আমরা আপনাদের সাহায্য সহযোগীতা চাই। মানুষ যেন তৈরীই ছিল, শুধু ডাকের অপেক্ষা। সেই ডাক অবশেষে এসে যায়। অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া যায় সর্বসাধারণ্যের কাছ থেকে। তিন ধরনের সাহায্য সহযোগীতা নিয়ে মানুষ ম্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। নিজের কাছে সযতেœ রক্ষিত মুক্তিযুদ্ধের স্বারক নিয়ে আসেন কেউ, কেউ আসেন অর্থ সাহায্য নিয়ে আর কেউ আসেন মানসিক সাহয্য নিয়ে। জাদুঘরের প্রাণ হচ্ছে এর স্মারক। যথেষ্ট না হলে তো গ্যালারী প্রদর্শনী সাজনো যাবে না। আর সেই স্মারক দেখেইতো  মানুষ খুজে ফিরবে মহান মুক্তিযুদ্ধকে তার সমস্ত নষ্টালজিক অনুভূতি দিয়ে। এই ব্যপারটিতেই প্রথমে জোড় দেয়া হয় এবং যোগাড়ও হয়ে যায় বেশ পরিমানে ভালো কিছু স্মারক। সেগুলো দিয়ে সাজানো হতে থাকে গ্যালারী। কিন্তু  ট্রষ্টিরাতো কেউ জাদুঘর বিশেষজ্ঞ নন। সাহয্য নিতে হয় জাদুঘর বিশেষজ্ঞদের। যেতে হয় বিভিন্ন জাদুঘরে, তাদের ডিসপ্লে দেখতে হয়। অভিজ্ঞ লোকদের নিয়ে আসতে হয়। উপর নীচ মিলিয়ে ছয়টি কক্ষে সংগৃহীত স্মারক দিয়ে ডিসপ্লে করতে হবে, এর শুরু হবে কি দিয়ে এবং শেষ হবে কোথায়। ট্রাস্টিরা সিদ্ধান্ত নেন যে জাদুঘর শেষ করা হবে ষোলই ডিসেম্বর বিকেলে জেনারেল নিয়াজীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে। এতে ভবিষ্যতে অনেক কনট্রোভার্সি এড়ানো যাবে। জাদুঘরের নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে।
ট্রাস্টি মফিদুল হক ডিসপ্লে সাজানোর ক্রমধারার কাজটির পরিকল্পনা করে ফেলেন। লেখাপড়া জানা পন্ডিত মানুষ মফিদুল হক। নিজে প্রচুর লেখালেখি করেন। প্রখর তার স্মরণশক্তি। ইনবিটুইন লাইন কোন লেখা পড়েন না। একবার তাকিয়ে যেন স্ক্যান করে নেন এবং গড়গড়িয়ে মুখস্থের মত তা পরবর্তিতে বলে দেন। নিজে ইনট্রোভাট টাইপের মানুষ, প্রচার প্রচারণার মধ্যে থাকেন না, কথা কম বলেন, সদালাপি, মিষ্টভাষী। মানুষটির এমন সহজাত ক্ষমতা যে আগামীর জিনিস তিনি এখনই দেখতে পান। তার পেশকৃত পরিকল্পনা সবাই গ্রহণ করেন। সেভাবেই শুরু হয়ে যায় জাদুঘর সাজনোর কাজ। শুরু হয়ে যায় অপার ব্যস্ততা। যেন দক্ষযক্ষ ব্যাপার চলে বাড়িটার প্রাঙ্গণ জুড়ে।

স্থায়ী কর্মচারী নেই। ট্রাস্টিরা নিজেরাই হাত লাগান। তারা সবাই ব্যস্ত মানুষ। ডাঃ সারওয়ার আলী একটি বহুজাতিক নামকরা ঔষুধ কোম্পানীর প্রধান নির্বাহীর দয়িত্ব পালন করছেন। আসাদুজ্জামান নূর, আলী যাকের, সারা যাকের তখন টেলিভিশন নাটকে আর থিয়েটার পাড়ায় মঞ্চ কাঁপিয়ে অভিনয় করে যাচ্ছেন। স্থপতি রবিউল হুসাইন চাকুরির পাশাপাশি দেশের লিডিং স্থপতি হিসেবে বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী স্থাপত্যের নকশা প্রণয়ন আর নির্মাণ শৈলী নিয়ে ব্যস্ত সমস্ত সময় পার করছেন, করছেন সাহিত্য চর্চা, দারুণ সব কবিতা লিখছেন, বনে গেছেন পুরোদস্তুর নাম করা কবি। মফিদুল হক প্রকাশনী ব্যাবসা আর লেখালেখি, ওয়ার্কশপ, সেমিনার শিল্প সাহিত্যের সভা সমিতি নিয়ে অতি ব্যস্ত। আক্কু চৌধুরী দীর্ঘদিন আমেরিকায় পরবাসী জীবন শেষে দেশে ফিরে এসে দিয়েছেন নিজস্ব গ্যালারী এবং শুরু করেছেন অন্যান্য ব্যবসা। তার প্রতিণ্ঠানে বড় বড় করে লিখে রেখেছেন, রাজাকারের প্রবেশ নিষেধ। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নানা কর্মকান্ড। জিয়াউদ্দিন তারিক আলী পেশায় ইঞ্জিনীয়ার। দীর্ঘদিন পশ্চিমা বিশ্বে নাম করা কোম্পানীতে কাজ করে দেশে ফিরে নিজেই শিল্প প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা হিসেবে কর্মযজ্ঞে জড়িয়ে পড়েছেন। সুষ্ঠ ধারার তরুণ চলচিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের সাথে যোগ দিয়ে মুক্তির গান নামে ছবি তৈরীতে ব্যস্তভরা সময় কাটাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় চরিত্রে তিনি, ধারা বিবরণীর কন্ঠও তার নিজের। একাত্তরে একদল শিল্পী খোলা ট্রাকে চড়ে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে যেয়ে গান গেয়ে গেয়ে তাদের উজ্জিবিত করছেন। আমেরিকান সাংবাদিক লেয়ার লেভিন তাদের পিছু নিয়ে সেইসব দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করেছেন। দীর্ঘদিন অনাদরে অবহেলায় পড়ে থাকা সেই মূল্যবান ফুটেজ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তা দিয়ে তৈরী হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যত প্রামাণ্য চিত্র মুক্তির গান। তারিক আলী মহাব্যস্ত সেই সেই কাজ নিয়ে।
স্ব-স্ব ক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষেরা এখন নিজেদের নিয়োজিত করেছেন সর্বজনের সব থেকে কাক্সিক্ষত স্বপ্নটির    বাস্তবায়নে। প্রতিষ্ঠা করেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। নিজেরাই হাত লাগিয়েছেন বাড়ি সংস্কার, স্মারক বাছাই, ফ্রেম তৈরী, র‌্যাক, বক্স, শোকেস তৈরী, মডেল, রেপ্লিকা তৈরী, বাংলা ইংরেজীতে ক্যাপশন লেখা, দেয়ালে দেয়ালে সেগুলো ঝুলানো- এই সব কাজ। প্রয়োজনীয় মিস্ত্রি, করিগর, শ্রমিকের সাহায্য নিয়ে দ্রুততার সাথে কাজ তুলে আনার তাদের প্রাণান্তকর প্রয়াস। এর পাশাপাশি মানুষের সাথে যোগাযোগ, অনুদান গ্রহণ, স্মারক গ্রহণ, বিভাগে, জেলায় যেয়ে স্মারক সংগ্রহ, অনুদান সংগ্রহ, মিডিয়ার সাথে যোগযোগ ইত্যাদী কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন সমানভাবে। হাতে সময় কম। ১৯৯৬ এর ২৬ মার্চ রজত জয়ন্তীর বছর পূরণ হবে। তার আগেই স্বপ্নের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দরজা সবার জন্য খুলে দেয়া হবে। সময়ের সাথে তাই পাল্লা দিয়ে দিনরাত ট্রাস্টিরা কাজ করে যান। কোন কষ্টবোধ থাকে না, অতি পরিশ্রমের ক্লান্তিবোধ আসে না। সদা প্রফুল্লচিত্ত, আত্মতুষ্টি আর সৃষ্টিসুখের উল্লাস নিয়ে তারা নিরলস কাজ করে যান।
কাজ মোটামুটি গুটিয়ে আসে। প্রস্তুতিপর্ব শেষ। সেদিন বিকেলে আকাশ ভেঙ্গে নামে বৃষ্টি। বিরোধী দলের ডাকা হরতালে রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ। কোন বাধাই বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। চারিদিক থেকে মানুষ আসতে থাকে বাধ ভাঙ্গা জোায়াড়ের মত। নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই ঠাসাঠাসি ভিড় বাড়ির আঙ্গিনা উপচে ছড়িয়ে যায় সামনের রাস্তায়। মুক্তিযুদ্ধের তৃতীয় প্রজন্ম, শহীদ রাশেদুল হাসানের নাতনী অর্চি মঙ্গল-প্রদীপ জ্বালিয়ে উদ্বোধন করে জাদুঘর। ঝর ঝর বৃষ্টির সাথে চলতে থাকে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান, সুরেলা কন্ঠ তা ছড়িয়ে পড়ে, ভেসে বেড়ায় সমস্ত পরিবেশ জুড়ে। ভেজা শরীরে দাঁড়িয়ে থাকে হাজার হাজার মানুষ। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি…, জাতীয় সঙ্গীত চলাকালে  সকলে কন্ঠ মেলায়। তাতে ঝরে পড়ে হৃদয় নিংড়ানো আবেগ।
ঢাকা শহর যেন ভেঙ্গে পড়েছে সেগুন বাগিচার এই বাড়িটায়। কোথায় ছিল এত মানুষ, যাদের বুকের গহন গহীনে প্রোথিত রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের জন্য এমন গভীর ভালবাসা?  আনন্দ আর আবেগ মাখামাখি হয়ে সকলের চোখ সজল হয়ে আসে। হ্যা, এখন একটা ঠিকানা হল, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ রয়েছে সযতেœ, পরম মহিমায় মহিমাম্বিত হয়ে। সবার আসার একটা জায়গা হল, নিজের জায়গা। ট্রাষ্টিরা বুঝে যান, তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, তারা গণমানুষের জাদুঘর তৈরী করেছেন, এখন মানুষই তাদের নিজস্ব শক্তি দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান টেনে নিয়ে যাবে। তারাই এটা টিকিয়ে রাখবে আবহমান কাল। ভবিষ্যত নিয়ে শংকিত হওয়ার কিছু নেই। সেদিন ছিল ২২ মার্চ ১৯৯৬, স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী পূরণের ঠিক দুদিন আগের দিন সেটা।
সেই থেকে এই বাড়ি আর জাদুঘর মাখামাখি হয়ে এক হয়ে গেছে।

শুরুতে ট্রাস্টিরা নিজের হাতে কাজ করেছেন, প্রয়োজনে শ্রমিক ভাড়া করেছেন। কিন্তু সংগ্রহ ও কাজের কলেবর বৃদ্ধির সাথে সাথে স্থায়ী লোকের প্রয়োজন হয়। স্মারক সংগ্রহকারী আব্দুল মতিন, রশীদ মিয়াকে নিয়োগ দেয়া হয়। এ দুজনই জাদুঘরের প্রথম স্থায়ী কর্মী। উদীয়মান আবৃত্তি শিল্পী, উদ্যোমী যুবক রফিকুল ইসলামসহ আরো ক’জন আসে স্বেচ্ছাসেবক কর্মী হিসেবে। আসে প্রশাসনিক অফিসার, হিসাব রক্ষকসহ কজন কর্মী। তাদের মধ্যে জাদুঘরের মমতার বাধনে আটকা পড়ে যায় শুধু রফিক। তার আর কোথাও যাওয়া হয়না।
হাসান সাহেব, চন্দ্রজিৎ, আমেনা, নাসির, অনামিকা, লীনা, কামাল- এরাও যোগ দিয়ে জাদুঘরের পবিত্র আর আপন পরিবেশ ছেড়ে আর যেতে পারেনা। নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করে এরা প্রাথমিক অবস্থা থেকে জাদুঘরকে গড়ে তুলতে থাকে। পরবর্তীতে যোগ দেয় কবির, ফাতেমা, সুরাইয়া, শাহাদাত, খোকন, মোস্তফা, রনজিত, সত্যজিৎ, রনিকা, কবিতা, মিতুয়া, রঞ্জন, ফখরুল, হারেস, নাজমা, জেবা, আনন্দ, মামুন, নুসরাত, নুরুদ্দিন, সেলিনা ও রুমা। জাদুঘরের আপন ভূবনে মিলেমিশে এরা একাকার হয়ে যায়।
আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে যোগ দেয় বুলু, মিজান, কালাম। বুলু ৫২ হাজার ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা স্ক্যান ও ডিজিটালইজেশনের কঠিন কাজটি করে ফেলে। মিজান ২৩ হাজার মৌখিক ভাষ্যের কম্পোজ করে ৪ টি মৌখিক ভাষ্য গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করে দেয়।
ডক্যুমেন্টশন সেন্টারে আমেনার সাথে যোগ দেয় একদল ঝকঝকে ছেলেমেয়ে। মনপ্রাণ ঢেলে তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যায়। শরীফ, দীপ, বিপাশা, নীতা, কাজল, মির্জা, কাজী, চৈতী, মন্টুু বাবু- এরা আমেনার তত্ত্বাবধানে হাজার হাজার ডকুমেন্টস্ সাজিয়ে, গুছিয়ে, ডিজিটালইজেশন করে ডক্যুমেন্টেশন সেন্টারকে আপটুডেট করে তোলে।
জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে জি- ফোর নিরাপত্তা বাহিনী জাদুঘরের নিরাপত্তা দিয়ে যায়। নাছির আর আমজাদ মিলে মিরপুর জল্লাদখানা বধ্যভূমি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে যায় ঝমেলা ছাড়াই।
মাসুকের নেতৃত্বে উইথ লিভিং লিজেন্ড গ্র“প, শরীফের নেতৃত্বে একাত্তরের তরুণ পদযাত্রী দল, মিশুর নেতৃত্বে লিগ্যাল টিম অবিরত জাদুঘরে স্বেচ্ছাসেবক সার্ভিস দিয়ে যায়।
এরা সবাই জাদুঘরের প্রাণ।  একটা কর্মসূচি মুখর জাদুঘর, যা কিনা পরিণত হয়েছে জনগণের জাদুঘরে। একটার পর একটা কাজ আসে, কর্মসূচি আসে, দিনরাত পরিশ্রম করে এরা সফলভাবে সেগুলো তুলে দেয়। এখানে কাজ নির্দিষ্ট করা থাকলেও সব কাজই সবার – এই মনোভাব নিয়ে সবাই এই বাড়িটার সাথে একাত্মা হয়ে মিলে মিশে কাজ করে যায়। এখান থেকে চলে যেতে হবে ভাবলেই সবার মন বিষাদঘন হয়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবতাতো এই যে এখান থেকে চলে যেতেই  হবে।
এই আনন্দ ভবন নামের বাড়িটা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে ডেভেলপাররা এখানে নির্মাণ করবে বহুতল আবাসিক ভবন। ভবিষ্যতের এখানকার বাসিন্দারা জানবেও না এখানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নামে সবার প্রিয় জনমানুষের একটা প্রতিষ্ঠান ছিল। পুরাতন মানুষেরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রচন্ড নষ্টালজিক অনুভূতি নিয়ে খুজে বেড়াবে আজকের এই বাড়িটাকে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে যাবে ।
তাদের দ’ুচোখ তখন কি অশ্র“সজল হয়ে উঠবে না?

-০-

LWM is 1113 weeks* old
with over 6,54,187 visitors till today

WE THANK YOU FOR BEING ONE OF THEM

Museum Hours

The Museum is open on all
weekdays except Sunday between
10:00 AM to 6:00 PM.
In winter it is open between
10:00 AM to 5:00 PM.
Ramadan Time (রমজান সময়সূচি)
10:00 AM to 3:30 PM.

Audited Financial Statements and Audit Reports Years: 2010-2016