Annual Speech 2013 (Dr. Atiur Rahman)

aamra
Comments Off on Annual Speech 2013 (Dr. Atiur Rahman)

চার দশকের বাংলাদেশ : অর্থনীতির নবযাত্রা

ড. আতিউর রহমান, গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
২২ মার্চ ২০১৩
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঢাকা

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম আর অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয় স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ, বাংলাদেশ। এই বিজয়ে আনন্দের পাশাপাশি অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ ও ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তেভেজা একাত্তরের কথা কখনো ভুলবার নয়। এ মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অংশ নিয়েছেন, রক্ত ঢেলেছেন, জীবন দিয়েছেন সেই মুক্তিযোদ্ধাদের আর যে মহানায়কের নেতৃত্বে আমরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক হতে পেরেছি, সেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। স্বাধীনতার পর চার দশক পার করেছে বাংলাদেশ। একটি দেশ বা জাতির ইতিহাসে চার দশক হয়তো খুব বেশি সময় নয়, একটি প্রজন্মেরও কম। তবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় অগ্রগতির জন্য এই সময়কাল তেমন কমও নয়। বাস্তবে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি বিগত চার দশকে অনেক সাফল্য যেমন অর্জন করেছে, তেমনি এর বেশকিছু ব্যর্থতাও আছে। এই প্রেক্ষাপটে চার দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ও অর্জনের একটি পর্যালোচনা ‘চার দশকের বাংলাদেশ : অর্থনীতির নবযাত্রা’ শীর্ষক এই বক্তৃতার মাধ্যমে আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আয়োজক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের জাতীয় জীবনের এক তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে এই বক্তৃতাটি আয়োজনের জন্য। শাহবাগে তরুণ প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধাভিমুখী চেতনার উন্মেষক্ষণে এই আয়োজন গভীর তাৎপর্য বহন করে। আমাদের সচেষ্ট স্বাধীনতার ফলস্বরূপ হালের গতিময় অর্থনীতির বিশ্লেষণ ও আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার গ্রহণের এইতো সময়।

২। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের পেছনে ছিল গভীর সব স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। সেই স্বপ্নে ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণ থেকে মুক্তি, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং আত্মনির্ভরশীলতার অঙ্গীকার। বাংলাদেশের অভ্যুদয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বে সংঘটিত হলেও একটি কথা মনে রাখতে হবে, এই স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল চালিকাশক্তি ছিল অর্থনৈতিক মুক্তির তীব্র আকাক্সক্ষা। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে চরম আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের কারণেই বেগবান হয়েছিল স্বাধীনতার সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলনের সুদৃঢ় আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যেসব আন্দোলন দানা বাঁধে সেগুলোর পেছনে বাঙালির অর্থনৈতিক বঞ্চনার অনুভ‚তি সক্রিয় ভ‚মিকা রাখে। তবে, ষাটের দশক থেকে এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বরূপ আরো স্পষ্টভাবে উদ্ঘাটিত হতে শুরু করে জনগণের কাছে। সে সময়কার কিছু দেশপ্রেমিক বাঙালি অর্থনীতিবিদের গবেষণা ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছিল বৈষম্যের প্রকৃত চিত্র। তাঁদের হিসাব থেকেই জানা যায় যে, জনসংখ্যার দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান বৃহত্তর অংশ হওয়া সত্তে¡ও জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ থাকতো পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। পূর্ব পাকিস্তান থেকে কর আদায় হতো এলাকার জন্য মোট বরাদ্দেরও বেশি। বৈদেশিক সাহায্যের বেশির ভাগ বরাদ্দ পেতো পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের কৃষিপণ্য রপ্তানির (মূলত পাট ও চা) পুরোটাই ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে। ১৯৭০ সালে নির্বাচনের একটি পোস্টারে অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানে বছরে রাজস্ব ব্যয় ছিল ৫০০০ কোটি টাকা, পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ১৫০০ কোটি টাকা। চাল, আটা ও তেলের দাম পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে ছিল দ্বিগুণ। কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বিভাগের চাকুরির প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানীদের দখলে। কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়, বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপরও নিপীড়ন নেমে আসে। এসব বৈষম্য ও বঞ্চনা পুঞ্জিভ‚ত হয়ে ক্রমশ রূপ নেয় গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে, যার বহিঃপ্রকাশ ও সফল সমাপ্তি ঘটে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। পশ্চিম পাকিস্তানের এসব শোষণ প্রতিরোধ করার লক্ষ্যেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক ছয়-দফা উপস্থাপন করেন বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিক্ষুব্ধ বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয় সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে। ঐ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তা সত্তে¡ও পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দিতে রাজি ছিল না। তারপরের ইতিহাস সবারই জানা। উত্তাল মার্চের ২৬ তারিখের প্রথম প্রহর থেকে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এর আগে তার প্রস্তুতিপর্ব চলে পুরো মার্চ মাস ধরেই অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মূল কথাটিও ছিল সকল ধরনের শোষণ থেকে মুক্তি। অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টিও বেশ স্পষ্ট করেই উঠে এসেছিল ঐ অতুলনীয় ভাষণে।

৩। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয় আলো-আঁধারের মধ্য দিয়ে। আলোর দিকটি হলো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতা থেকে মুক্তির যে অদম্য আকাক্সক্ষা ছিল বাংলাদেশের জনগণের, তা পূর্ণ হয়। আকাক্সক্ষা ছিল সামাজিক বৈষম্য দূর করা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত, গতিশীল এবং উদার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। আর আঁধারের দিকটি হলো উত্তরাধিকার সূত্রে বাংলাদেশকে একটি দারিদ্র্যপীড়িত ও ভঙ্গুর অর্থনীতির হাল ধরতে হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে শুধু দারিদ্র্যই ছিল না, দারিদ্র্য দূর করার জন্য যে হাতিয়ারগুলো থাকা প্রয়োজন, সেগুলোও বাংলাদেশের ছিল না। ছিল না অর্থ, অবকাঠামো, শিল্প কিংবা দক্ষ জনশক্তি। তখন বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ, অর্ধাহার-অনাহার কবলিত, বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি দরিদ্র দেশ হিসেবে। দেশের বন্দর, পরিবহন ব্যবস্থা ও শিল্প-কারখানা ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত। পাট ও চা এর মতো কয়েকটি পণ্যে সীমিত ছিল রপ্তানি বাণিজ্য। বিদেশ থেকে আসতো না কোন রেমিট্যান্স। ছিল না বিদেশী মুদ্রার তেমন কোন রিজার্ভ। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের নাজুক ও ভঙ্গুর আর্থ-সামাজিক অবস্থা দেখে অনেকেই হতাশ হয়েছিলেন এবং এর স্থায়িত্ব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার সত্তর দশকের বাংলাদেশকে বিদেশী সাহায্যনির্ভর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। নরওয়ের অর্থনীতিবিদ ফাল্যান্ড ও ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ পারকিন্সন বাংলাদেশকে বলেছেন ‘উন্নয়নের পরীক্ষাগার’। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত বই ‘বাংলাদেশ : টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট’-এ তারা লিখলেন, ‘এ রকম পরিস্থিতিতে যদি বাংলাদেশের উন্নয়নের উদ্যোগ সফল হয়, তাহলে পৃথিবীর যে কোনো দেশেই এ ধরনের উদ্যোগ সফল করা যাবে’। এই অর্থনীতিবিদদ্বয় ২০০৭ সালে তাদের পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন, ‘তিন দশক এবং তার বেশি সময়ের সীমিত ও বর্ণাঢ্য অগ্রগতির ভিত্তিতে মনে হয় বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব’। অর্থাৎ এককালের নেতিবাচক ধারণা পোষণকারীরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে এখন বাংলাদেশকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। নামকরা সব বিশ্ব গণমাধ্যমের চোখেও হালের বাংলাদেশের বিস্ময়কর অগ্রগতির ভঙ্গিটি প্রতিনিয়তই ধরা পড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় এখনো বাংলাদেশ উন্নয়নের পরীক্ষাগার, তবে ইতিবাচক অর্থে। এত কম মাথাপিছু আয়ের দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সুসংহতকরণ এক সাথে চলতে পারবে কিনা, সুশাসনের অসম্পূর্ণতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব সত্তে¡ও এত প্রবৃদ্ধি হলো কেমন করে, রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার পর্যাপ্ত উন্নতি না হলেও এ রকম প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাবে কিনা, এসব বিষয়ে বাংলাদেশকে এখন উন্নয়নের পরীক্ষাগার বলা হচ্ছে।

৪। বৈদেশিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বহুজাতিক বিনিয়োগ সংস্থা গোল্ডম্যান স্যাক্সের পূর্বাভাসের গ্রহণযোগ্যতা যথেষ্ট। এক দশক আগে সংস্থাটি চারটি দেশের সম্ভাবনার কথা বলেছিল। দেশগুলো ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া এবং চীন। দেশগুলোর আদ্যাক্ষর নিয়ে সংক্ষেপে এদের নামকরণ করা হয়েছিল ব্রিক (ইজওঈ)। তাদের পূর্বাভাস সত্যি হয়েছিল। পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে যুক্ত করে এই অর্থনৈতিক জোটের নামকরণ হয় ব্রিকস। সম্প্রতি গোল্ডম্যান স্যাক্স সমীক্ষা-পর্যালোচনা করে ‘ব্রিকস’ ছাড়া সম্ভাবনাময় আরো ১১টি দেশের একটি নতুন তালিকা তৈরি করেছে। এ দেশগুলোর অর্থনীতিও এগিয়ে আসছে বলে এদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নেক্সট ইলেভেন’। এই উদীয়মান এগারটি দেশের অন্যতম বাংলাদেশ। সংস্থাটি বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেছে, দেশটির বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার বেশির ভাগই তরুণ। এদের মাধ্যমে দেশটির ভবিষ্যত বদলে দেয়া সম্ভব। আমারও বিশ্বাস, সচেতন তরুণ সমাজই বাংলাদেশের সম্ভাবনার প্রতীক। তাদের প্রত্যয়, প্রযুক্তিপ্রিয়তা, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সাহস ও দক্ষতাই বাংলাদেশকে দ্রæতলয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার সব ধরনের সুযোগ বাংলাদেশে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের পূর্বাভাসে বলেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ‘নেক্সট ইলেভেন’ সম্মিলিতভাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ২৭টি দেশকে ছাড়িয়ে যাবে। লন্ডনের জাতীয় দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ২০৫০ সালে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির বিচারে পশ্চিমা দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে। বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলোর এসব পূর্বাভাসই প্রমাণ করে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। তাছাড়া, মুডি’স ও স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর’স গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের সন্তোষজনক অর্থনৈতিক রেটিং দিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রক্ষেপণও স্থিতিশীল ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের ইঙ্গিত বহন করে।

৫। গত চার দশকের পথচলায় বাংলাদেশের অর্জনের তালিকা খুব ছোট নয়, বরং গর্ব করার মতো অনেক অর্জন রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি খাতের উৎপাদন, তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, যার পেছনে রয়েছে এ দেশের কৃষক, মেহনতি ও শ্রমজীবী মানুষের অবিস্মরণীয় অবদান। কৃষি প্রধান দেশ হলেও বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। সত্তর দশকের প্রথম দিকে দেশে চাল উৎপাদন হতো এক কোটি টন। জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। উৎপাদিত খাদ্যে ষাট ভাগ চাহিদা মিটতো। বাকি খাদ্য আমদানি করতে হতো। অথচ বিদেশী মুদ্রার মজুদ ছিল সামান্য। তাই বিদেশীদের কাছে খাদ্য সাহায্যের জন্য নিয়মিত হাত পাততে হতো। গত চার দশকে কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। কৃষকদের সৃজনশীলতা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে এক খাদ্য-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। একাত্তরের তুলনায় খাদ্য উৎপাদন সাড়ে তিনগুণেরও বেশি বেড়ে ২০১১-১২ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে তিন কোটি ৫৭ লাখ টন। সরকারি হিসাবে দেশে চাল ভোগের পরিমাণ বছরে দুই কোটি ২০ লাখ টন। অর্থাৎ দেশে চাল উদ্বৃত্ত রয়েছে। গত দু’বছর ধরে বাংলাদেশ বাইরে থেকে চাল আমদানির ইতি টেনেছে। উপরন্তু, উদ্বৃত্ত চাল রপ্তানি করা যায় কিনা তা নীতি-নির্ধারণী মহলে ভাবা হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন আর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নয়, বরং ঐ ঝুড়ি এখন খাদ্য ও বিদেশী মুদ্রায় পরিপূর্ণ হয়ে উপচে পড়ছে। এখন আর বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হয় না। ‘মঙ্গা’ শব্দটিও দেশ থেকে নির্বাসিত। অল্প সময়ে এত বড় সাফল্য কৃষকরাই এনেছেন। মুক্তিযুদ্ধের মতই কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সংগ্রামে কৃষকরা বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। তারাই আমাদের প্রকৃত বীর। কৃষি উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি এগিয়েছেন নারীরাও। কৃষকদের সাথে যারা কৃষি খাতের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন, নীতি-পরিকল্পনা নির্ধারণ করেছেন, কৃষির উন্নয়নে ঋণ দিয়েছেন-তাদের অবদানও স্বীকার করতে হয়।

৬। দেশের অর্থনীতির নবযাত্রায় গার্মেন্টস শিল্পের ভ‚মিকা অসামান্য। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এভাবে দাঁড়াবে তা দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় কেউ ভেবেছেন বলে মনে হয় না। আমার মনে আছে সত্তরের দশকে কিছু টেইলারিং শপ গড়ে উঠেছিল কমলাপুর এলাকায়। সেখান থেকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানিকারক দেশ। এই অসামান্য সামল্য গাথার অগ্রনায়ক ছিলেন দেশ গার্মেন্টসের বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল কাদের খান। বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে এখন বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের ওপরে, একমাত্র চীনের পরেই তার অবস্থান। বাংলাদেশের যেসব খাত থেকে রপ্তানি আয় আসে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে এই তৈরি পোশাকশিল্প। মোট রপ্তানি আয়ের ৭৮ শতাংশই আসছে এ খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমজীবী এ পেশায় নিয়োজিত, যার আশি শতাংশই নারী এবং বেশির ভাগ শ্রমিকই এসেছে কৃষক পরিবার থেকে। শ্রমবাজারে এদের অংশগ্রহণ সামাজিক সূচক উন্নয়নেও ভ‚মিকা রাখছে। মজুরি অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বেশ খানিকটা কম হলেও এই শ্রমিকরা খুবই দক্ষ, কাজও করে অনেক বেশি। বাংলাদেশ এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম খরচে উন্নত মানের পোশাক তৈরি করে চলেছে। চীনেও তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি এখন বাড়ছে। তাই তারা পোশাক শিল্পের মতো শ্রমঘন শিল্প থেকে তাদের বিনিয়োগ হাইটেক ও ভারী শিল্পের দিকে সরিয়ে নিচ্ছে। তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও এখন চীনের পরিবর্তে বাংলাদেশমুখী হচ্ছেন। চামড়া শিল্পেও একই অবস্থা। বাংলাদেশকে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। আর তা করা গেলে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে আরো অগ্রগতি হবে। শুধু রপ্তানির জন্যই নয়, স্থানীয় বাজার চাহিদার কারণেও এ শিল্প দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিকশিত হবে বলে আশা করা যায়। তবে, এর জন্য প্রয়োজন হবে ভ‚মি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। কাল বিলম্ব না করে গড়ে তুলতে হবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল যাতে থাকবে জ্বালানির নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ। থাকবে পর্যাপ্ত কানেকটিভিটি ও নিরাপত্তা। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সহিংসতায় আমাদের অগ্রসরমান রপ্তানি খাত বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতির দ্রæত অবসান কাম্য। আর সেজন্য সকলকেই একযোগে কাজ করে যেতে হবে।

৭। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এখন আমাদের অর্থনীতির অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ যে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে তার মূলে ভূমিকা রাখছে এই রেমিট্যান্স। স্বাধীনতার আগে বিশ্ব শ্রমবাজারে বাঙালিদের প্রবেশ ছিল সীমিত। বিদেশে বাঙালি কর্মীর সংখ্যা ছিল একেবারেই নগণ্য। স্বাধীনতা যেন বিশ্বের কর্মদুয়ার খুলে দিয়েছে বাংলাদেশীদের জন্য। বাংলাদেশের মানুষ আজ ছড়িয়ে পড়েছে দেশান্তরে। বাংলাদেশের একটি গ্রামও বুঝি এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে গ্রামের কিছু মানুষ বিদেশে কাজ করেন না। হালে নারী কর্মীরাও ব্যাপকহারে বিদেশে যাচ্ছেন। বর্তমানে পৃথিবীর দেড় শতাধিক দেশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিদেশে গিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশের প্রায় ৮০ লাখ কর্মী। প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে। রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক দিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে সপ্তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। বৈদেশিক রেমিট্যান্সের পরিমাণ জিডিপি’র ১০ শতাংশের ওপর দাঁড়িয়েছে, যা স্বাধীনতার পরের তিন দশক পর্যন্ত ছিল ৫ শতাংশ। এই রেমিট্যান্স আমাদের প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যের প্রায় ১০ গুণ, বৈদেশিক বিনিয়োগের ১৩ গুণ এবং মোট রপ্তানি আয়ের ৫৩ শতাংশ। ২০১২ সালে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। বর্ণিত সময়ে রেমিট্যান্স এসেছে ১৪.২ বিলিয়ন ডলার। অর্থবছর হিসেবে ধরলে গত অর্থবছরেও রেকর্ড হয়েছে, প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আর চলতি অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। রেমিট্যান্স আকারে যে বিদেশী মুদ্রা আসছে তা কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে। ফলে কৃষি ব্যবস্থা আধুনিকায়ন হচ্ছে। উৎপাদন বাড়ছে আশানুরূপভাবে। বিদেশী মুদ্রা রিজার্ভেও বিশেষ অবদান রাখছেন প্রবাসী কর্মীরা। তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের কল্যাণে চলতি বছরের শুরুতেই বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ ১৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। রিজার্ভ মার্চ মাসের শুরুতেই ১৪ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ভেঙ্গেছে। আমাদের মতো একটি দেশের বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ ‘ডাবল ডিজিটে’ স্থিতিশীল রাখতে পারা নিঃসন্দেহে বিরাট এক সাফল্য। বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের মতো আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। এ কারণে মুডি’স এবং স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর’স এর মতো আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলোর কাছেও বাংলাদেশের এগিয়ে যাবার স্থিতিশীল ভঙ্গিটি এক অপার বিস্ময়ের বিষয়।

৮। আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির পথে দৃঢ় পদক্ষেপেই যে এগুচ্ছে বাংলাদেশ তা সাদা চোখেও ধরা পড়ছে। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাজস্ব বাজেট ছিল ২৮০ কোটি টাকা। রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট মিলে চলতি অর্থবছরে তা প্রায় এক লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকা। স্বাধীনতার পর প্রথম দশকের (১৯৭২-৮১) তুলনায় গত দশকে (২০০২-১১) টাকায় গড় নমিনাল জিডিপি ২৮ গুণ বেড়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছর শেষে নমিনাল জিডিপি দাঁড়িয়েছে ৯১৪৮ বিলিয়ন টাকা। সত্তরের দশকে জিডিপি’র গড় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র এক শতাংশ। বর্তমানে ৬ শতাংশেরও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে বাংলাদেশ। গত তিন অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৪ শতাংশ হারে। চলতি অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি এই হারের চেয়ে বেশিই হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। অবশ্যি, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও এই অর্জন অনেকাংশেই নির্ভরশীল। আমরা এখন ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দিকে এগোচ্ছি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আকাক্সিক্ষত ফলাফল দারিদ্র্য নিরসনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পেরেছে। দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চার দশক আগে দারিদ্র্যের হার ছিল ৭০ শতাংশেরও বেশি। ২০১০ সালে দারিদ্র্য ৩১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে তা ২৯ শতাংশের নিচে। বৈষম্যের সূচকও হয় স্থিতিশীল অথবা নিম্নমুখী। তাই সামাজিক উন্নয়নের ধাপকেও সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি’র অন্যতম একটি লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২০১৫ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে সাফল্য অর্জন করেছে তাতে মনে হচ্ছে নির্ধারিত সময়ের আগেই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। সরকারি ও অ-সরকারি নানা উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ জনসংখ্যা দ্রæত বৃদ্ধির হারের রাশ টেনে ধরতে সক্ষম হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে দেড় শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশী নারীরা গড়ে ৬.৩টি সন্তান জন্ম দিতেন। এ সংখ্যা ২০১১ সালে দাঁড়িয়েছে ২.৩। এটা সেই হারের কাছাকাছি, যে পর্যায়ে পৌঁছালে দেশের জনসংখ্যা দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল থাকে। স্বাধীনতার আগে মাথাপিছু আয় ছিল ১০০ ডলারের মতো, সেখানে ২০১২ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৮৫০ ডলার। মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে ৭৭২ ডলার। দুই দশক আগেও যেসব শ্রমিকের দৈনিক আয় শত টাকার নিচে ছিল, তাদের দৈনিক আয় এখন প্রায় ৪০০ টাকা। সংসারের দৈনিক খরচ মিটিয়ে এখন কিছু না কিছু এদের হাতে থাকে। সেই উদ্বৃত্ত দিয়ে দেশে তৈরি নানা শিল্পপণ্য তারা কিনতে পারছে। এভাবেই দেশের ভেতরেই একটি শক্তিশালী চাহিদা কাঠামোর ভিত্তি তৈরি হয়েছে। আর এ কারণেই আমরা অনেক দেশের চেয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি। এত অল্প সময়ে বিশ্বের অনেক দেশই এমন সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।

৯। আমাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বেশকিছু ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০১১ সালে জাতিসংঘের এমডিজি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুমৃত্যুর হার, নারীর ক্ষমতায়ন, এইচআইভি-এইডস প্রতিরোধ-এ ধরনের এমডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ হয় পুরোপুরি নতুবা আংশিক সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৫ সালের মধ্যে বা তার আগেই এমডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে সঠিক পথেই রয়েছে বাংলাদেশ। শিশু মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাতিসংঘ পুরস্কার অর্জন করেছে। মানবস্বাস্থ্যের উন্নয়ন প্রশ্নে ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় ধরা হয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এ খাতে জাপানের অগ্রগতিকে। মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সফলতা জাপানের ঐ অগ্রগতির সঙ্গে তুলনীয়। ১৯৭১ সালে শিশুমৃত্যুর হার ছিল ১৪.৬ শতাংশ। ২০১১ সালে তা ৩.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। ভারতে এ হার এখনো ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে মা-মৃত্যুর হার ১৯৯১ সালে ছিল ৪.৭২ শতাংশ, ২০১১ সালে তা ২.১৮ শতাংশে নেমে এসেছে। গত দুই দশকে বাংলাদেশে মা-মৃত্যুর হার কমেছে ১.৫৬ গুণ, একই সময়ে ভারতে কমেছে ১.৪৮ গুণ। মানুষের গড় আয়ু চার দশকের ব্যবধানে ৫০ থেকে ১৯ বছর বেড়ে ৬৯ বছরে দাঁড়িয়েছে। এই গড় আয়ু এখন প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে ৪ বছর বেশি, যদিও ভারতীয়রা মাথাপিছু আয়ের সূচকে দ্বিগুণ ধনী। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ছয় ভাগের একভাগ এখনো অপুষ্টিতে ভুগলেও তা চার দশক আগের তুলনায় অনেক কম। তখন এক-তৃতীয়াংশ মানুষই অপুষ্টির শিকার ছিল। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর হারও ভারতের (৪৩.৫%) চেয়ে বাংলাদেশে (৪১.৩%) কম। বাংলাদেশের এসব সাফল্যের কারণ ব্যাপক জনসচেতনতা। সরকারি ও অ-সরকারি উদ্যোগগুলোর মিলিত সাফল্য এটি। এক সময় যে জনগোষ্ঠীর নিত্যসঙ্গী ছিল কুসংস্কার, আধুনিকতার প্রতি ছিল যারা বিরূপ আজ তারাই শিশুদের টিকা দেয়ার জন্য ছুটছেন, খাবার স্যালাইন খাওয়াচ্ছেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন। গত চার দশকে জনগণের শিক্ষার হার দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে শিক্ষার হার ছিল ৩২ শতাংশ, ২০১১ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৫৬ শতাংশে। প্রাথমিক শিক্ষায় নারী-পুরুষের আনুপাতিক অসাম্য দূরীকরণে বাংলাদেশের সাফল্য বিশাল। প্রাথমিক স্তরে ১৯৯০ এর দশকে ছেলেমেয়ের অনুপাত যেখানে ছিল ৫৫ ঃ ৪৫, ২০০০ সালে সেটি দাঁড়ায় ৫০ ঃ ৫০-এ। মাধ্যমিক স্তরে বিনামূল্যে নারী শিক্ষার কল্যাণে বর্তমানে শিক্ষায় নারী-পুরুষ অনুপাত সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ ঃ ৪৭-এ। আর্থ-সামাজিক অবস্থার এসব ইতিবাচক সূচকই প্রমাণ করে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ‘বিস্ময়কর অগ্রগতি’ হয়েছে।

১০। গত এক দশক থেকে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে গেছে। জাতিসংঘের ২০১১ সালের প্রতিবেদনে মানব উন্নয়ন সূচকে ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৬-এ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গত ত্রিশ বছরে ৬৫ শতাংশ অগ্রগতি অর্জন করেছে, যেখানে পাকিস্তান ও ভারতের অগ্রগতি যথাক্রমে ৪০ ও ৫৯ শতাংশ। এটি বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য গর্বের বিষয়। বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্যের প্রশংসা করে নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মন্তব্য করেছেন, মানবসম্পদ উন্নয়নে ভারতের অবস্থান প্রতিবেশী বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ। তিনি একাধিকবার লিখেছেন, ‘এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট সাফল্য যে, অল্প মাথাপিছু আয়ের দেশ হওয়া সত্তে¡ও বাংলাদেশ অতি দ্রæত অনেক কিছু করতে সক্ষম হয়েছে।’ ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, বরং অনেক দেশের জন্য অনুকরণীয় একটি দেশ। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের উন্নয়নকে বিস্ময়কর বলে অভিহিত করেছে। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সাবেক গভর্নর সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ¦ল। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও পূর্বাভাস ২০১৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিগত সালে দক্ষিণ এশিয়ায় ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিত্র ছিল ‘অনুকূল’। প্রবাসী আয় ও ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধিই এই ‘অনুকূল’ চিত্র তৈরিতে মূল ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছে জাতিসংঘ।

১১। বাংলাদেশের এসব প্রশংসা বা স্বীকৃতির পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। সীমিত সম্পদ সত্তে¡ও কী করে কম আয়ের একটি লড়াকু দেশের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব, সেই উপাখ্যান খুবই চমকপ্রদ। নিঃসন্দেহে, অর্থনীতিতে বিরাট রূপান্তর ঘটেছে। কৃষিনির্ভরতা কমেছে, বেড়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প ও সেবা খাতের গুরুত¦। একেবারেই সংকীর্ণ শিল্প ভিত্তি নিয়ে যে দেশটির যাত্রা শুরু হয়েছিল চার দশক আগে, তার সাথে তুলনা করলে বলা যায়, বাংলাদেশের শিল্প বিকাশের ধারায় বৈচিত্র্য এসেছে। ঐতিব্যবাহী বস্ত্রখাত বলার মতো একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। নতুন শিল্প হিসেবে ওঠে এসেছে হালকা প্রকৌশল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাত, ওষুধ ও রসায়ন, চামড়া ও পাদুকা, সিরামিক, সিমেন্ট, জাহাজ নির্মাণ শিল্প ও তথ্য প্রযুক্তি খাত। পাট খাতের পুনর্জীবন ঘটছে। রপ্তানি বাণিজ্যেও এসেছে নানামুখী বৈচিত্র্য। শুধু নানা পণ্য নয়, নানা দেশেও যাচ্ছে সেসব। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশও শিল্প খাতে বৈচিত্র্য আনতে সহায়ক হয়েছে। স্বাধীনতার পর গত চার দশকে স্ফীত ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্যকর এক অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়েছে, যা একদিকে অর্থনীতিকে সুদৃঢ় করেছে অন্যদিকে ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করেছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত মাত্র ছয়টি ব্যাংক ছিল। বর্তমানে সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশী মিলে মোট ব্যাংক রয়েছে ৪৭টি। শিগগিরই আরো ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের কার্যক্রম শুরু করবে। এসব ব্যাংকের ৮৩০০টির বেশি শাখার সমন্বয়ে বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। শহরের চেয়ে গ্রামেই ব্যাংকের শাখা বেশি। ব্যক্তি খাতের ব্যাংকগুলোও শহরের সমান বা বেশি গ্রামীণ শাখা খুলতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অভাবনীয় পুনর্জাগরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সদ্য প্রচলিত মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। নিমিষেই অর্থ লেনদেনের এই ব্যবস্থা সারা দেশের ব্যাংকিং বহির্ভূত জনগোষ্ঠীর জীবনে এক নয়া আশার আলো প্রদান করে চলেছে। বর্তমানে সবগুলো ব্যাংক শাখায় সাড়ে ৫ কোটির বেশি আমানতকারী ও প্রায় এক কোটি ঋণ গ্রহীতা রয়েছে। আর মোট আমানত ও ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৫৩৯৬ ও ৪৩১৯ বিলিয়ন টাকা।

নিঃসন্দেহে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। ঐ উদ্বৃত্ত ব্যবহারে বিপুল সংখ্যক নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হয়েছেন। খুদে ও মাঝারি উদ্যোগের আশাতীত বিকাশ ঘটেছে। মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। কাজের সুযোগ, উপার্জনের পথ পেলে নির্ধিদ্বায় কাজে নেমে পড়ছে আমাদের দেশের মানুষ। একজনের সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছে আরেকজন। এভাবেই কর্মসংস্থানের স্রোতধারা ছড়িয়ে পড়ছে দেশব্যাপী। হাঁস-মুরগি, মৎস্য চাষ, দুগ্ধ খামার এবং কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্প করে সফল হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। সে জন্যই বলা যায়, বাংলাদেশের চার দশকের সাফল্যের গল্প আসলে ব্যাপকহারে উদ্যোক্তার উত্থানের গল্প; বিশেষকরে তরুণ উদ্যোক্তাদের অসাধারণ সাফল্যের গল্প। এসব উদ্যোগী ও পরিশ্রমী মানুষদের উপযুক্ত সহযোগিতা করা গেলে সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়ন আরো তরান্বিত হবে। খুলে যাবে স¤ভাবনার আরো অনেক দুয়ার। সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ ইজ অন দ্যা মোভ্। জাতি হিসেবেও আমাদের রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের এই গানের সাথে সুর মিলিয়ে পর্যটক ইবনে বতুতাও বাংলাদেশের রূপে মুগ্ধ না হয়ে পারেননি। নদী বিধৌত এ দেশ যেমন রূপে বিশ্বরাণী তেমনি এর প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি ঈর্ষান্বিত বিশ্বশক্তিও। বাংলাদেশ শুধুমাত্র পত্র-পল্লবে, ফুলে-ফলে সুরোভিত এক নয়নাভিরাম দেশ নয় বরং অনেক সীমাবদ্ধতা সত্তে¡ও এ দেশের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। আমাদের সম্ভাবনার খাত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দেশ জুড়ে, এখন প্রয়োজন শুধু পরিচর্যার। আর দরকার নিঃসঙ্কোচে এগিয়ে যাওয়া।

বাংলাদেশ নিয়ে সবার আশাবাদের একটি বড় কারণ এর জনসংখ্যা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় সুবিধা হলো, জনসংখ্যায় কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের জনসংখ্যা বাড়ছে ১.৫ শতাংশ হারে, কিন্তু কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাড়ছে ২.৮ শতাংশ হারে। জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তার তুলনায় আগামী দুই থেকে তিন দশকে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকবে। এখানে তরুণদের সংখ্যা বয়স্কদের তুলনায় অনেক দিন বেশি থাকবে। আর এই তরুণ জনশক্তি দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে। এটি একটি সুযোগ, যা একবারই আসে। এরূপ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে চীন ও ভারত। চীনের কর্মক্ষম মানুষ উৎপাদন খাতে বেশি কাজে লেগেছে, আর ভারতে কাজে লেগেছে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। এটিকে বলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’। বিশ্বব্যাংকের মতে, এ জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে প্রতিবছর ১৫ লাখ মানুষকে কাজ দিতে হবে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে জনশক্তিকে আরো দক্ষ করতে হবে। বাংলাদেশের তরুণ কর্মক্ষম জনশক্তিই বিদেশে কাজ করে আয় করছে প্রচুর বিদেশী মুদ্রা। পড়াশোনা শিখে এখন আমাদের তরুণরা শুধুমাত্র চাকরির পেছনে ছুটছে না। বরং নতুন উদ্যোক্তা হবার চেষ্টা করছে। কতো ধরনের কাজকর্ম হচ্ছে, কতো রকমের প্রয়াস আর উদ্যোগ। কাজটি ছোট কিংবা বড় যাই হোক যে যার মতো করে তার অবস্থা উন্নয়নের চেষ্টা করছে। আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প করে তারা নানা ক্ষেত্রে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ যে টেকসইভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে তার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে গ্রামীণ অর্থনীতি। গ্রামে এক ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ ঘটেছে। গ্রামে শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। গ্রামে তিন বেলা খাবার দিয়েও ৪০০ টাকার নিচে এখন শ্রমিক পাওয়া যায় না। আগে অর্জিত মজুরি দিয়ে বড়জোর দুই বা আড়াই কেজি চাল কেনা যেত। এখন সেই মজুরি দিয়ে নয়-দশ কেজি চাল কেনা যাচ্ছে। মজুরি বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে গ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ব্যাপক সম্প্রসারণ। গ্রামের মানুষের একটা বিরাট অংশ কৃষির বাইরে গিয়ে শ্রম দিচ্ছেন। তাই কৃষি শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে বলেই এমনটা ঘটছে। গ্রামে সবজি, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশুর খামার গড়ে উঠেছে। অনেকেই মাছ চাষ করে বেকারত্ব নিরসন করছেন। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল চাষ হচ্ছে। গৃহসজ্জার জিনিসপত্র তৈরি হচ্ছে। ছোট-মাঝারি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানা রকম উদ্যোগ বিস্তার লাভ করেছে। রিক্সা-ভ্যান, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী মেরামতের কাজও ব্যাপকভাবে ঘটছে। মানুষ গ্রামীণ অর্থনীতির এই সম্প্রসারণের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করছেন। এর ফলে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের হার বেড়েছে। গ্রামের দরিদ্র মানুষেরও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। ক্ষেত শ্রমিক, দিনমজুর, যারা সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে বাড়তি রোজগারে লাগিয়ে দিতেন, এখন তারা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন। গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মিত হচ্ছে। আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে। গ্রামের কৃষক এখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, গ্রামে বসেই তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে দৈনন্দিন কাজ সারেন। গ্রামীণ অর্থনীতির এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে শহরের মানুষ গ্রামে গিয়ে বসবাস করতে উৎসাহিত হবেন।

আমাদের আছে উর্বর ভ‚মি ও বিশাল জনসংখ্যা। দেশের জনশক্তির ৬০ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত। ২০১১-১২ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ১৯ শতাংশের বেশি। কৃষি ক্ষেত্রে আমাদের সম্ভাবনার খুব কমই আমরা কাজে লাগাতে পেরেছি। বাংলাদেশের কৃষিতে যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে সেটিকে যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে কৃষি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে পারলে নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্য রপ্তানি করা সম্ভব। বাংলাদেশকে কৃষিভিত্তিক শিল্পোন্নত দেশেও পরিণত করা সম্ভব। ফলের জুস তৈরি, পোলট্রি, ডেইরি, বø্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল পালন, মৎস্য, ভোজ্যতেল, পাম চাষ, মুক্তা চাষ, শুটকি এসব সম্ভাবনাময় খাত উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। উৎপাদন আরো বাড়ানোর জন্য দেশের কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এ লক্ষ্যে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞানীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রসার ঘটাতে হবে কৃষিভিত্তিক শিল্পের। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্যও বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ ‘রিফাইন্যান্সিং’ জানালা খুলে দিয়েছে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য নানা সুযোগ আমাদের সৃষ্টি করে যেতে হবে।

শিল্পের কথা উঠলেই আমরা শুধু তৈরি পোশাকশিল্পের কথা বলি। কিন্তু আরো অনেক শিল্প আছে যা ইতোমধ্যেই সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। এগুলোকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। আমাদের ওষুধ শিল্প বিশ্ব বাজারে বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। গত এক দশকে এ শিল্প থেকে রপ্তানি আয় বেড়েছে পনের গুণ। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ। ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের ওষুধ তৈরি হচ্ছে এখন বাংলাদেশে। চিকিৎসা প্রযুক্তিতেও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিদেশমুখী প্রবণতা কমাতে পারলে দেশের কোটি কোটি ডলার সাশ্রয় হবে। জাহাজ নির্মাণ শিল্প ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের সম্ভাবনার বিশাল দুয়ার খুলে দিয়েছে। এ শিল্পে সক্ষমতার সাথে এগুচ্ছে বাংলাদেশ। অচিরেই বিশ্ববাজারে দৃঢ় অবস্থান সৃষ্টি করবে বলে মনে হচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের নির্মিত মাঝারি ও বড় আকারের জাহাজ ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি হয়েছে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা ওই জাহাজগুলো এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে সমুদ্র পথে বিশ্বের বন্দরে বন্দরে। বিশ্ববাজারে এ মুহূর্তে প্রায় ৪০ হাজার কোটি ডলারের জাহাজ নির্মাণের আগাম ফরমায়েশ রয়েছে, যার অন্তত তিনভাগ কাজ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো পেতে যাচ্ছে। এতে ১২০০ কোটি ডলার আয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ শিল্পকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারে। পরিবেশ রক্ষা করতে পারলে চামড়া শিল্পেরও প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে উন্নত মানের প্রচুর চামড়া পাওয়া যায়। এগুলো রপ্তানি করে প্রচুর বিদেশী মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এছাড়া, টেক্সটাইল, সিরামিক, সিমেন্ট, হালকা প্রকৌশল, কৃষি ও ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, প্লাস্টিক পণ্য, ইলেকট্রনিক্স, তথ্যপ্রযুক্তিগত পণ্য, বাইসাইকেল, প্রকাশনা, প্যাকেজিং, হিমায়িত খাদ্য দ্রব্য, কৃষিজাত পণ্য ও মসলা, সবজি, পাটজাত দ্রব্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। স্বাধীনতার পর যেখানে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল মাত্র ৯ ভাগ, তা এখন বেড়ে প্রায় ৩১ ভাগ হয়েছে। শিল্প খাতের এই বিকাশ স্বপ্ন দেখাচ্ছে ২০২১ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার। গত অর্থবছরে (২০১১-১২) দেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪.৩ বিলিয়ন ডলার, যা ১৯৭৩ সালের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি। অন্যদিকে বিগত অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৩৫.৪ বিলিয়ন ডলার। আমদানির এই পরিমাণ ১৯৭৩ সালের তুলনায় ১৬ গুণ বেশি। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির এক বিশাল রূপান্তর। বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতা নির্ণয়ে আমদানির এই বিশাল ভলিউম একটি অকাট্য প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে।

আমাদের সফট্ওয়্যার শিল্পের বিকাশের ধারাও খুবই আশাপ্রদ। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এগিয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রসরমান দেশগুলোতে এ খাতে ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়ার ফলে এসব দেশের বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে ভাবা হচ্ছে। প্রতি বছর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্যপ্রযুক্তিগত জ্ঞান লাভ করে এ খাতের দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হচ্ছে হাজারো তরুণ। তথ্যপ্রযুক্তিতে পারঙ্গম এসব তরুণ প্রজন্মের পদচারণায় নানামুখী ‘আউটসোর্সিং’ তথা বিজনেস প্রসেসিং শিল্পের প্রসার ঘটছে। ইতোমধ্যে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আয়ের সেরা দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ স্থান করে নিয়েছে। ফ্রি-ল্যান্সিং এর ক্ষেত্রেও ব্যাপক অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তরুণ উদ্যোক্তারা এ ক্ষেত্রেও ব্যাপক সাফল্য দেখিয়ে চলেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় রেগুলেটরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সম-মূলধন উন্নয়ন তহবিল (ইইএফ)-কে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশের জন্যে উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে।

বাংলাদেশকে আমদানিনির্ভর দেশ থেকে রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করা সম্ভব। স্বাধীনতার চার দশক পর বাংলাদেশে রপ্তানি খাতে বিশাল রূপান্তর ঘটেছে। ১৯৭২ সালে রপ্তানি আয়ের ৭০ ভাগ ছিল পাটের দখলে। কৃত্রিম তন্তু আবিষ্কারের ফলে সত্তরের দশকেই পাটের চাহিদা কমে যায়। আশির দশকে ধীরে বিকাশ লাভ করে শ্রমঘন পোশাক খাত। বর্তমানে ৭৮ ভাগ রপ্তানি আয় আসছে পোশাকশিল্প থেকে। রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রচলিত পণ্যের সাথে ব্যাপকভাবে অপ্রচলিত পণ্যের সংখ্যা বাড়ছে। তৈরি পোশাক, চা, তামাক, চামড়া, ওষুধ, জাহাজের পাশাপাশি সিরামিক, সিমেন্ট, আসবাবপত্র, প্লাস্টিক পণ্য, বাইসাইকেল, তথ্যপ্রযুক্তিগত পণ্য, মাছ, চিংড়ি, শুটকি, কাঁকড়া, ফুল, সবজি, পেয়ারা, টুপি, নকশিকাঁথা, বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্য, মৃৎশিল্প রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

বিপুল জনশক্তির এই দেশে দ্রæত শিল্পের বিকাশ ঘটছে। উন্নত বিশ্বে উৎপাদনের জন্য যেখানে জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের রয়েছে উদ্বৃত্ত বিপুল জনশক্তি। এছাড়াও রয়েছে কাঁচামাল, জ্বালানি সম্পদ এবং উৎপাদনোপযোগী প্রাকৃতিক পরিবেশ। প্রয়োজন আরো ক্ষুদে, মাঝারি ও বড় শিল্প স্থাপন। আর শিল্প স্থাপনে প্রয়োজন বিনিয়োগ। বিশ্বের নামি-দামি কোম্পানিগুলো আমাদের দেশে ব্যবসা করতে চাচ্ছে। অনেক কোম্পানি ব্যবসা করছেও। আমাদের বুঝতে হবে লাভ বা সম্ভাবনা না থাকলে তাদের আসার কথা নয়। কিন্তু শুধু বিদেশী বিনিয়োগনির্ভর হলে একটি দেশের স্থায়ী সমৃদ্ধির অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সেজন্য দেশীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হবে, তাদের বিনিয়োগের প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে। স্বদেশী বিনিয়োগের ফলে দেশের মানুষ দেশের প্রতিষ্ঠানে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করবে। তাই বিনিয়োগের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সম্ভব হলে যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বড় শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। পিপিপি সেলকে আরো সক্রিয় ও উদ্যোগী হতে হবে। এখানেও বাংলাদেশ ব্যাংক তার সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে রেখেছে।

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর না হলেও যে সম্পদ আছে তা খুব একটা কম নয়। এ দেশের মাটি, পানি ও মানুষ হলো বড় সম্পদ। এছাড়া, মাটির নিচে লুকিয়ে আছে তেল, গ্যাস, কয়লার মতো প্রচুর জ¦ালানি ও খনিজ। এসবের সঠিক উত্তোলন ও ব্যবহার দেশের উন্নয়নকে আরো তরান্বিত করতে পারে। গ্যাস উন্নয়নে সর্বশেষ প্রযুক্তি গ্রহণ করার নীতি উদ্যোগ আমাদের নিতে হবে। কয়লা উত্তোলন করে আমাদের পঞ্চাশ বছরের জ¦ালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে সে জন্য লাগসই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের জনজীবন ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলো মাথায় রেখে উপযুক্ত নীতি-সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের আরেকটি সম্ভাবনা হলো সমুদ্র এলাকা। এখানে আধুনিক সমুদ্র বন্দর গড়া সম্ভব। তাছাড়া, এখানে তেল-গ্যাস ছাড়াও আছে অন্যান্য খনিজ সম্পদ ও অফুরন্ত মৎস্য সম্পদ।

পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ঈর্ষনীয়। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে স্থান, ঐতিহাসিক স্থান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অঞ্চল ও আধুনিক স্থাপনাগুলো পর্যটন শিল্পে অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও নদ-নদীতে আধুনিক বিলাসবহুল প্রমোদতরী, বান্দরবান-রাঙামাটিতে ‘কেবল কার’সহ নানা সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে। অনিবাসী বাংলাদেশীরা (এনআরবি) আসছে। আসছে বিদেশী বিনিয়োগকারী। সবার কথা মনে রেখেই এই শিল্পের দ্রæত বিকাশে আমাদের মনোযোগী হতে হবে।

সরকারের বাইরের উদ্যোগ-যেগুলোকে আমরা এনজিও বলি, সেগুলোরও অনেক অবদান আছে। বিশ্বে বাংলাদেশকে ক্ষুদ্রঋণের প্রবর্তক হিসেবে স্বীকার করা হয়। বিশ্বব্যাপী আত্মকর্মসংস্থানভিত্তিক দারিদ্র্য নিরসনে সুুনিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্রঋণ বিরাট ভূমিকা রাখছে। গ্রামের গরিবদের ভোগে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এনজিও’র ভূমিকা উল্লেখ করার মতো। ক্ষুদ্রঋণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার মতো অনেক ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলো বিরাট ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

বিগত দশকগুলোতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশল এবং ব্যাপকভিত্তিক নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কর্মসূচির ফলেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল অর্জন সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে, সাম্য সহায়ক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ; খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ইত্যাদি কার্যক্রমে জাতীয় বাজেটে নিয়মিতভাবে অর্থ বরাদ্দ রাখা; রাজস্ব আহরণে অব্যাহত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ; খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদারকরণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে সমর্থন; বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ কর্মসূচি, দেশের প্রত্যন্ত জনপদে আর্থিক সেবা পৌঁছানোর জন্য আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা ও মোবাইল ফোন কো¤পানীর মধ্যে অংশীদারিত¦মূলক ব্যয়সাশ্রয়ী নতুন নতুন সৃজনশীল সেবা প্রবর্তন ইত্যাদি কৌশল এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই প্রক্রিয়াকে আরো বেগবান করার জন্য দ্রæতই এজেন্ট ব্যাংকিং-এর গাইডলাইন দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

১২। গত চার দশকে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের যে অর্জন তাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। এই সময়ে আরো কতটা অর্জন করা সম্ভব ছিল তা-ও পর্যালোচনার দাবি রাখে। তবে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক থাকবেই। চার দশকে আমাদের সব আশা পূরণ না হলেও অনেক আশাই পূরণ হয়েছে বলা যায়। আমাদের যে অর্থনৈতিক শক্তি আছে, তার পরিচয় আমরা এরই মধ্যে দিয়েছি। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, তা ধরে রাখার মতো উপযুক্ত রাজনীতির চর্চা আমরা করতে পারছি কিনা।

চার দশকে বাংলাদেশকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে, এখনো করতে হচ্ছে। এমন চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র। দারিদ্র্য নিরসনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য সত্তে¡ও এখনো আমাদের সাড়ে চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যে এবং আড়াই কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যে ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের পরিবেশগত সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েছে। উপকূলীয় ও নদীভাঙন এলাকায় জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু প্রভাবিত উপক‚লীয় অঞ্চলে দারিদ্র্য নতুন করে বাসা বেঁধেছে। বিরূপ পরিবেশে টিকতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানচ‚্যত হচ্ছেন। যদিও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের স্বকীয় সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তবু বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কালো মেঘের বিস্তারে তা নিতান্তই অপ্রতুল বলে মনে হয়। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। গ্রীন ব্যাংকিংসহ জলবায়ু মোকাবেলার লক্ষ্যে বেশকিছু সৃজনশীল উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করেছে। তবে আরো অনেকটা পথ পাড়ি দেবার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

বাংলাদেশের অফুরন্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোও এখন চ্যালেঞ্জ। আসলে আমরা কাজে লাগাতে পেরেছি আমাদের সম্ভাবনার একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র। আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠী থেকে বিশাল প্রাপ্তির যে সম্ভাবনা ছিল, তা আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আমাদের জনসংখ্যার বেশির ভাগই তরুণ। এই বিশাল কর্মক্ষম তরুণরাই বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চাবিকাঠি। দেশ গড়ার যুদ্ধে এই তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগাতে হবে। তারুণ্যকে প্রকৃত অর্থেই সম্পদে পরিণত করার জন্য প্রয়োজন তাদের মধ্যে দক্ষতার বীজ বপন করা। দক্ষতা উন্নয়নের জন্য দরকার প্রশিক্ষণ, নয়া উদ্যোক্তা সৃজনসহ নানামাত্রিক বিনিয়োগ। তরুণদের জন্য দরকার কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মতো শ্রমঘন শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটানো দরকার। দেশের সব মানুষই একটু ভালো থাকতে চায়, স¦চ্ছল থাকতে চায়। সমাজের নিম্নস্তরে যারা আছেন, তাদের জীবনে পরিবর্তন আনতে হলে আরো সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি তাদের জন্য প্রচলিত সামাজিক নিরাপত্তা বলয়টিকে আরো স্বচ্ছ প্রযুক্তিনির্ভর, জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী করতে হবে।

প্রযুক্তির এই যুগে জ¦ালানি খাতে আমাদের আরো বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে। বিদ্যুৎ, জ¦ালানিসহ ভৌত অবকাঠামো এখনো অপর্যাপ্ত। আমাদের দেশে অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে যেগুলোকে সঠিক উপায়ে কাজে লাগিয়ে স্বল্প মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। আশার কথা হচ্ছে, বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাস্টার প্ল্যান তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকার এখন সেই পথেই হাঁটছে। ইতোমধ্যে রাশিয়ার সাথে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের বিষয়ে চুক্তি হয়েছে। এর মাধ্যমে ৫০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। কয়লা থেকে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বর্জ্য থেকে জ¦ালানি তৈরির উদ্যোগগুলোকেও সমর্থন দিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক নবায়নযোগ্য জ¦ালানি উৎপাদনে যেসব সৃজনশীল উদ্যোগ নিয়েছে সেগুলোর ব্যাপ্তি আরো বাড়াতে হবে।

আমরা এখনো রাস্তা-ঘাট, সেতু, বন্দর ও রেলের পর্যাপ্ত উন্নয়ন করতে পারিনি। রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার সাথে সংযুক্ত আশপাশের এলাকা যানজটে বিপর্যস্ত। এসব জায়গায় উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। সম্প্রতি এদিকে সরকার বেশ খানিকটা নজর দিয়েছে। অনেকগুলো ফ্লাইওভার নির্মাণ সম্পন্ন হবার পথে। তবে, এদিকে আরো নজর দিতে হবে। স্বল্প ব্যয়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে রেল ও জলযানকে উন্নত করা প্রয়োজন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতে ৪ ঘন্টার মধ্যে যাতায়াত করা যায় তার জন্য দ্রæতগামী রেল, উন্নত মানের বাস চলাচলের প্রকল্প হাতে নিতে হবে।

আয়তনের দিক থেকে বিশ্বে ৯৪-তম অথচ জনসংখ্যার দিক থেকে অষ্টম বৃহত্তম দেশ আমাদের বাংলাদেশ। জনসংখ্যার চাপে চাষ উপযোগী ভ‚মির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এটি আমাদের জন্য ভয়াবহ অবস্থা ডেকে নিয়ে আসতে পারে। গ্রামেও পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তুলতে হবে। গ্রামের মানুষের জন্য কাজের আরো সুযোগ তৈরি করতে না পারলে শহরের ওপর প্রচন্ড চাপ বাড়বে। একইসঙ্গে পরিবেশবান্ধব ও সুশাসিত নগর ব্যবস্থাপনায় আমাদের নজর দিতে হবে।

বেকারত্ব এখনও একটি ভয়ঙ্কর সমস্যা। বেকারত্ব নিরসনে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের মানুষের উপার্জনের অন্যতম উৎস হতে পারে পশু ও মৎস্য সম্পদ। এই দুটি খাত খুব দ্রæত উন্নতি করছে। বেকারত্ব নিরসনে বৃহৎ কাজের বাজার সৃষ্টি করতে হবে। আর কাজের বাজার সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ। বিদেশের বাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চলমান সরকারি উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট বেসরকারি খাতকেও সুশাসনের আওতায় রেখে উৎসাহিত করে যেতে হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ম্যানুফেকচারিং শিল্পে বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সে জন্য দ্রæতই বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহজে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ার পথ তার নীতি-সংস্কারের মাধ্যমে সুগম করে দিচ্ছে। আমরা চাই দেশীয় বিনিয়োগও বেশি হোক। তাহলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। বিনিয়োগকারীদের কাছে আমাদের অনুরোধ, আপনাদের সমস্যা থাকলে এবং কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে, কিভাবে সহায়তা দরকার তা বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করুন। কেননা, আমরা দেশীয় বিনিয়োগ বাড়াতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। প্রবাসী বাঙালিদেরও স্বদেশে বিনিয়োগ করার নানা সুযোগ আমাদের সৃষ্টি করতে হবে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ায় নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেয়াটাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থ, বুদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। যারা আগে ব্যাংক থেকে ঋণ পেতেন না, যেমন-প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষি, নতুন উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা তাদের কাছে যেন ব্যাংক ঋণ যায় তার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। যারা প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা, যেমন-গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, লেদার, সিরামিকস, সিমেন্ট, জাহাজ নির্মাণ খাতে, তারাও যেন প্রয়োজনীয় অর্থ পায় তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা দূর করতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক অঙ্গীকারাবদ্ধ।

ইংরেজি ভাষা ও কম্পিউটার জ্ঞানের অভাবে প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনাকে আমরা সেভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। তাই নতুন প্রজন্মকে ইংরেজি ও কম্পিউটারে পারদর্শী করার জন্য দরকার জাতীয় পর্যায়ের উদ্যোগ ও বেসরকারি বিনিয়োগ। শিক্ষাঙ্গনেও প্রযুক্তি প্রসারে আরো মনোযোগী হতে হবে।

উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, আসিয়ান ও জিএমএস-এর দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে গড়ে তুলতে হবে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট। পাশের বড় দেশ ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ছে। এই ধারা যেন আরো গতি পায় সেদিকে সংশ্লিষ্ট জনদের সার্বক্ষণিক নজর রাখতে হবে।

অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে উপযুক্ত নীতি নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়ন করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের রয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের অভাব। রয়েছে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সঠিক উপায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা। সর্বত্র ছড়িয়ে আছে দুর্নীতির কালো ছায়া। এ দুর্নীতি দূর করতে না পারলে অর্জিত উন্নয়ন টেকসই হবে না। সমাজে প্রকৃত অর্থে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। এখনো বেশকিছু বিশৃঙ্খলা রয়েছে। দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ না করলে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার আরো উচ্চতর হতে পারতো। তাই অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখা এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলোকে সঠিকভাবে মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কার্যকর সুশাসন।

১৩। বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির পথে বাধাগুলো যেহেতু চিহ্নিত, সেহেতু এগুলোর অপসারণ নিশ্চয়ই দুরূহ নয়। এ বাধাগুলো মোকাবেলার মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে বলে আমি মনে করি। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে নানা প্রতিক‚লতা মোকাবেলা করেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি চলমান বৈশ্বিক মন্দার অভিঘাত মোকাবেলায় যথেষ্ট দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে এর প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রবৃদ্ধির হারের বিচারে এখন দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই প্রথম স্থানে অবস্থান করছে। দারিদ্র্য দূর করাই আমাদের প্রবৃদ্ধির আসল লক্ষ্য। সে কারণেই অন্তর্ভুক্তিমূলক এই উন্নয়নের ধারা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে যেতে হলে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের ক্ষেত্রে বাজার উন্নয়ন দরকার। আরো দক্ষ শ্রম রপ্তানি করে প্রবাসী-আয় বাড়াতে হবে। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রেও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক দেশকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে গতিশীল করতে সমাজের পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধ কর্মকাÐে বাংলাদেশ ব্যাংক সুপরিকল্পিত নীতিমালা তৈরি করেছে এবং আর্থিক খাতে সেগুলো বাস্তবায়ন করে চলেছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সেই কৌশলগত পরিকল্পনারই বড় এক অংশ। এ লক্ষ্যে কৃষি, এসএমই এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে পর্যাপ্ত ও দৃশ্যমান ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য ইতোমধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে পুনঃঅর্থায়ন স্কীম চালু, কৃষক ও অবহেলিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্যে ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল ব্যাংকিংসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যয়সাশ্রয়ী সৃজনশীল ব্যাংকিং সেবা আমরা চালু করেছি। মানব সম্পদ উন্নয়ন, তরুণদের শ্রেণীর দক্ষতার উন্নয়ন, দ্রæত দারিদ্র্য নিরসন, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সরকারের রাজস্ব ব্যয় বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো, স্থানীয় ও বিদেশী ব্যক্তিখাতের উদ্যোক্তাদের জন্য উপযুক্ত নীতি-পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। একইসঙ্গে বাজার যেখানে অপূর্ণাঙ্গ সেখানে সমাজ যেন এগিয়ে আসে তা মাথায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষাবৃত্তি, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ¦ালানির উন্নয়ন, ঐতিহ্য, শিল্প ও সাহিত্যের উন্নয়নে বড় মাপের সিএসআর কার্যক্রমে মনোনিবেশ করার আহŸান করেছে। এ আহŸানে ব্যাংকগুলো ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছে। গত চার বছরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিএসআর অর্থায়ন সাড়ে সাত গুণ বেড়েছে। গত বছরে তারা প্রায় তিনশ কোটি টাকা সামাজিক দায়বদ্ধ খাতে ব্যয় করেছে বলে আমাদের প্রাথমিক হিসাবে জানা গেছে। এসব কর্মকাÐ অব্যাহত রাখা গেলে সামাজিক দায়বদ্ধ অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়নের মডেল হিসেবে বাংলাদেশ অচিরেই দাঁড়িয়ে যাবে।

১৪। বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধশালী শান্তিপূর্ণ আবাসযোগ্য দেশ হিসেবে গড়ে তোলার আনুষঙ্গিক যথেষ্ট কিছূ আমাদের রয়েছে। বিশ্বের নামকরা বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশকে আরো কিভাবে এগিয়ে নেয়া যায় তার জন্য প্রচেষ্টা জোরালোভাবে অব্যাহত রাখতে হবে। বিজয়ের চার দশক পরে আমাদের চাওয়া বাংলাদেশ হোক ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত একটি সমুন্নত দেশ যেখানে থাকবে না কোন দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা। আয়ের বৈষম্য যে কোনো দেশের তুলনায় কম থাকবে। গ্রাম ও শহরের পার্থক্য অনেকটাই কমে আসবে, আন্তঃসংযোগ বাড়বে। আমরা চাই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক দেশের মডেল হতে। এ ধরনের একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি সবসময়, যার সাফল্য নির্ভর করে পুরো জাতির ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপর। বাংলাদেশের সব সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক প্রয়োজন। আমরা চাই, আমাদের বিপুল সম্ভাবনাময় প্রিয় দেশটি এগিয়ে যাক সফলভাবে। একবিংশ শতাব্দীর অগ্রসরমান বিশ্বে আমাদের প্রিয় মাতৃভ‚মি দাঁড়াক মাথা উঁচু করে। আসুন আমরা সবাই মিলে মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং দারিদ্র্য দূর করার সংগ্রামে এক হই। আসুন বিগত দিনের ব্যর্থতা ভুলে নতুন করে এগিয়ে যাবার শপথ নিই, কাজ করি স্বদেশের জন্য। ষোল কোটি বাঙালির বত্রিশ কোটি হাতকে কাজে লাগাই দেশ-জাতির কল্যাণে। এই মাটি ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তে ভেজা পবিত্র ভ‚মি। আমাদের বীর সেনানীরা দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তির জন্য জীবন দিয়েছিলেন। আমাদের মনে রাখতে হবে দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু দেশের মানুষ প্রকৃত অর্থে এখনও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে পারেনি। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য প্রয়োজন একটি অর্থনৈতিক বিপ্লব। এ ক্ষেত্রে মূল ভ‚মিকা পালন করতে হবে আমাদের তরুণ সমাজকে। তরুণ যোদ্ধাদের হাতেই মুক্তি পাবে গণমানুষের আকাক্সক্ষা, তাদের ত্যাগের মহিমায় প্রিয় মাতৃভ‚মি হয়ে উঠবে সুখ-স্বাচ্ছন্দের আকর। তারা যে এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে সক্ষম সে ইঙ্গিত এরই মধ্যে দিতে সক্ষম হয়েছে। শুভ হোক তাদের পদচারণা। ঘটুক আমাদের সকলের মাঝে দেশপ্রেমের পূর্ণ জাগরণ। কথায় জাগরণ, কাজে জাগরণ, লেখায় জাগরণ, ভাবনায় জাগরণ। সবমিলে জাগ্রত বাংলাদেশ হবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশে মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্র দিন দিন প্রসারিত হতে থাকবে। সেটিই একটি জাতির উন্নয়নের প্রধান লক্ষণ। ঠিক যেমনটি বরীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘…. যে-জাতি উন্নতির পথে বেড়ে চলেছে তার একটা লক্ষণ এই যে, ক্রমশই সে জাতির প্রত্যেক বিভাগের এবং প্রত্যেক ব্যক্তির অকিঞ্চিৎকরতা চলে যাচ্ছে। যথাসম্ভব তাদের সকলেই মনুষ্যত্বের পুরো গৌরব দাবি করবার অধিকার পাচ্ছে। এই জন্যেই সেখানে মানুষ ভাবছে কি করলে সেখানকার প্রত্যেকেই ভদ্র বাসায় বাস করবে, ভদ্রোচিত শিক্ষা পাবে, ভালো খাবে, ভালো পরবে, রোগের হাত থেকে বাঁচবে এবং যথেষ্ট অবকাশ ও স্বাতন্ত্র্য লাভ করবে।’ (‘বাতায়নিকের পত্র’, রবীন্দ্ররচনাবলী, দ্বাদশ খÐ, পৃ. ৫৮১)

পরিশেষে, লাখো শহিদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, তাঁদের স্বপ্নমাখা ‘সোনার বাংলা’ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং সুখী, সমৃদ্ধ ও সুন্দর একটি বাংলাদেশ গড়ার ভবিষ্যৎ কারিগরদের আগাম অভিনন্দন জানিয়ে শেষ করছি।

ধন্যবাদ সবাইকে।