মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবন উদ্বোধন : বাঙালির স্বপ্নের বাস্তবায়ন (সত্যজিৎ রায় মজুমদার)

aamra
Comments Off

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবন উদ্বোধনকালে ১৬ এপ্রিল ২০১৭ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশপ্রেমিক ও নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস জানতে হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন জানতে পারে, কত বড় ত্যাগের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা অর্জন করেছি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সেই স্মৃতিচিহ্নগুলো তারা দেখবে, উপলব্ধি করবে, অন্তরে ধারন করবে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। নতুন প্রজন্ম যেন মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলে না যায়। ২২ মার্চ ১৯৯৬ সেগুন বাগিচার একটি ছোট্ট বাড়িতে উদ্বোধনের পর এই নতুন ভবনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা শুরু একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন। কেননা এতো বিশাল কলেবরে ও আয়োজনে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা ছিল প্রতিষ্ঠাতাদেরও স্বপ্নের অতীত।

01
উদ্বোধিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবন

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবশন করেন ছায়ানটের শিল্পীবৃন্দ। পরে বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা, এবং ৩০ লক্ষ শহীদ স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন তারিক আলী স্বাগত বক্তৃতায় বলেন, আমাদের জন্য স্বপ্নপূরণের দিন আজ। ১৯৭৫ সালের পর যখন বাঙালির সবচেয়ে গৌরবময় মুহুর্তটি ভুলিয়ে দিয়ে পাকিস্তানের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া রাষ্ট্রযন্ত্রে পাকাপোক্ত করা হচ্ছিল, তখন ক্ষুদ্র পরিসরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা শুরু। তিনি রবীন্দ্রনাকে উদ্ধৃত করে বলেন, পৃথিবীর বড় বড় সভ্যতা দুঃসাহসের সৃষ্টি। শক্তির দুঃসাহস, বুদ্ধির দুঃসাহস, আকাক্সক্ষার দুঃসাহস। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে দুঃসাহসের মন্ত্র দিয়েছিলেন। তাঁর পথ ধরে আমরাও দুঃসাহসী হয়ে উঠেছিলাম কারণ বাঙালি মুক্তিযুদ্ধকে তাঁর হৃদয়ে ধারণ করে এবং ভালো কাজে বাঙালি কার্পণ্য করে না। আজ নতুন এক অভিযাত্রায় পাল তুলে দিয়েছে এই জাদুঘর। গত একুশটি বছর ধরে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবেসে এই জাদুঘরকে নানাভাবে তার সমর্থন, অর্থ ও স্মারক দিয়ে সহজ করেছে এর যাত্রাপথ এবং যে যেভাবে পারে সহায়তা করে এর পথচলাকে করেছে মসৃণ। সর্বস্তরের বাঙালির প্রতি আজ আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই। তিনি বলেন, ট্রাস্টিদের বয়স হয়েছে; তাই নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীকে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে নতুন ঠিকানার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এর পর ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে ট্রাস্টি ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নবযাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। এটি এ জাতির একটি আনন্দের দিন। খুব সহজ ছিল না জাদুঘরের পথ চলা, তারপরও বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আজ একটি শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই জাদুঘর। এটা অন্য জাদুঘরের মতো নয়, এখানে বাংলাদেশ কথা বলেÑ আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, গৌরব-সংগ্রাম, আত্মত্যাগ-ভাবাবেগ সব কিছুর বহিপ্রকাশ ঘটেছে এখানে, হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। ২১ বছরের পথ চলায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আজ আমাদের চেতনার বাতিঘর।

ঐতিহাসিক অনিবার্যতায় জাদুঘরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা একটি নিরন্তর ধারাবাহিক কাজ। এজন্য প্রয়োজন ছিল একটি সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা। তারই অংশ হিসেবে আমরা আটজন ট্রাস্টি মিলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গহণ করি। যদিও একটি ট্রাস্টের মাধ্যমে জাদুঘর পরিচালিত হয়, আমরা বিশ^াস করি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল মানুষই এর চালিকা শক্তি। এ জাদুঘর বাংলাদেশের সকল মানুষের জাদুঘর। সরকারি মূল্যে জমি বরাদ্দের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, যে সকল শিক্ষার্থী টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে জাদুঘর নির্মাণ তহবিলে দান করেছে এবং যে গৃহবধূরা সহায়তা দিয়েছেন তাদের এ ঋণ পরিশোধ্য নয়। ট্রাস্টি আসাদুজ্জামান নূর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ব্যক্তি যারা সহায়তা দিয়েছেন তাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীকে নতুন জাদুঘর ভবনের ছবি উপহার প্রদান করেন ট্রাস্টি ও স্থপতি কবি রবিউল হুসাইন।মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই জাদুঘর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রসারে নিবেদিত। দেশজুড়ে এই প্রতিষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি আগ্রহী করা, বাঙালির চিরকালীন অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রসারে কাজ করেছে যা ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। আমরা সৌভাগ্যবান যে, দেশের নতুন প্রজন্ম পাকিস্তানপ্রেমী জঘন্য ঘাতকদের সে ষড়যন্ত্র রুখে দিতে পেরেছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ অনুযায়ী একটি শান্তিপূর্ণ অসাম্প্রাদিয়ক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ছিল আমাদের। সর্বস্তরে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়ন না হলে জঙ্গীবাদ, হত্যা-নির্যাতন, সাম্প্রায়িকতা দূর করা সম্ভব নয়। বাঙালি প্রয়োজনে কত বড় আত্মত্যাগ করতে পারে তার উদাহরণ ১৯৭১। প্রয়োজনে এ জাতি তার আদর্শগত মুক্তির জন্য অনেক বড় সংগ্রামে পিছপা হবে না। যারা নিজের উদ্যোগে এমন একটা জাদুঘর গড়েছেন, যারা এর সহায়তা দিয়ে এর অগ্রগতিতে সাহায্য করেছেন, যারা কষ্ট করে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন সকলকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

জাদুঘরের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করার পরিকল্পনা। তখন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য বলতে ভয় এবং দ্বিধান্বিত ছিল সকলে। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এখন গর্ব করে তারা বলতে পারে আমি ‘মুক্তিযোদ্ধা।’ তখন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানও দেয়া যায়নি। অনেকে প্রাণ দিয়েছেন এই স্লোগান দেয়ার কারণে।

02
বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা, এবং ৩০ লক্ষ শহীদ স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন

জাদুঘরকে সহায়তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চরম প্রতিকূলতার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। তেমন পরিবেশের মধ্যে এর কাজ এগিয়ে নেয়ার জন্য ট্রাস্টিদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘আমার সব রকমের সহায়তা আপনারা পাবেন।’ তিনি জাদুঘরের সংরক্ষণের বিষয় উল্লেখ করে জানান, এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনা এমনি এমনি হবে না। এর জন্য যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজন। এর জন্য বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে। ব্যয় নির্বাহের জন্য জাদুঘরের নিজস্ব আয়েরও পথ থাকতে হবে। একটি ফান্ড তৈরি করে সেখান থেকে ব্যয় নির্বাহ করা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন।
03
শিশুদের মাঝে প্রধানমন্ত্রী

শিখা চির অম্লান প্রজ¦ালনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের সময় শিশুরা ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ গানের সাথে নেচে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানায়। একই সাথে তিনি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের ফলক উন্মোচন করেন। সে সময় তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে শিশুদের মাঝে কিছু সময় কাটান এবং পরে গ্যালারিসমূহ ঘুরে দেখেন।
প্রায় এক একর জায়গায় নির্মিত এই জাদুঘরে স্থায়ী চারটি গ্যালারিতে সংগৃহীত প্রায় ২৫ হাজারের মধ্যে স্থান পেয়েছে ১২শ স্মারক। প্রথম গ্যালারি ‘আমাদের ঐতিহ্য আমাদের সংগ্রাম’। উয়ারী বটেশ^র থেকে শুরু করে পাল-সেন আমল হয়ে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত বাঙালি সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক সমাজের নিদর্শন ঠাঁই পেয়েছে এখানে। দ্বিতীয় গ্যালারি ‘আমাদের অধিকার আমাদের ত্যাগ’। এখানে মূলত ১ মার্চ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব, শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে গমন ইত্যাদি রয়েছে। তৃতীয় গ্যালারি ‘আমাদের যুদ্ধ আমাদের মিত্র’। এখানে মুক্তিযুদ্ধের ভয়ংকর দিনগুলোয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি অত্যাচার, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশে^র সকল রাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ এবং ভারতের আন্তর্জাতিক তৎপরতার দলিল পত্রাদিও স্থান পেয়েছে। শেষ এবং চতুর্থ গ্যালারি ‘আমাদের জয় আমাদের মূল্যবোধ’। এখানে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব এবং ভারত-বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডে পরিচালিত সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের স্মারক স্থান পেয়েছে। বুদ্ধিজীবী হত্যা এখানকার মর্মান্তিক স্মারক। শেষে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের চিহ্ন পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্মারক দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে এই গ্যালারি।
04
দ্বিতীয় গ্যালারি ঘুরে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
05
বিলোনিয়া যুদ্ধক্ষেত্রের মডেলের সামনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন জাদুঘরের আট জন ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী, আসাদুজ্জামান নূর, আলী যাকের, সারা যাকের, আক্কু চৌধুরী, রবিউল হুসাইন, মফিদুল হক ও জিয়াউদ্দিন তারিক আলী।
২০১১ সালে জাদুঘর নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১০২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ছয় বছরে এর নির্মাণ শেষে উদ্বোধন হল বিশেষ বৈশিষ্ট্যম-িত স্থাপত্য নিদর্শনের এই জাদুঘর।

06
২০১১ সালের ৪ মে জাদুঘর নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

২২ মার্চ ১৯৯৬ সেগুনবাগিচায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর শুরুর দিনে প্রজ¦ালন করা হয়েছিল শিখা চির অম্লান। ১৫ এপ্রিল সকালে সেই শিখা নতুন প্রজন্মের ৭১ এবং সাইক্লিস্টরা সেহরাওয়ার্দী উদ্যান, শহীদ মিনার ৩২ নং ধানমন্ডি এবং মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স-১ হয়ে বহন করে নিয়ে আসেন নতুন জাদুঘরে। এখানে তা গ্রহণ করেন ৭১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

0708

শিখা চির অম্লন-এর মশাল হস্তান্তর

LWM is 1113 weeks* old
with over 6,54,187 visitors till today

WE THANK YOU FOR BEING ONE OF THEM

Museum Hours

The Museum is open on all
weekdays except Sunday between
10:00 AM to 6:00 PM.
In winter it is open between
10:00 AM to 5:00 PM.
Ramadan Time (রমজান সময়সূচি)
10:00 AM to 3:30 PM.

Audited Financial Statements and Audit Reports Years: 2010-2016